দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা আছে পাটের তৈরি বিভিন্ন কারুপণ্য। আর এই পাটের হস্তশিল্পে ভাগ্য খুলেছে আছিরনের। তার তৈরি ম্যাট, ব্যাগ, দোলনা, পুতুল, কলমদানি যাচ্ছে জাপান, জার্মানি ও ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। গ্রামের দেড় শতাধিক অবহেলিত নারীকেও স্বাবলম্বী করেছেন তিনি। তাই রংপুর পায়রাবন্দের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সংগ্রামী আছিরন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আছিরুন বলেন, আমি ১৯৯৮ সালে ‘অনেক আশা কুটির শিল্প’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করি। সেখানে পাটের কাজ তৈরি করা শিখেছি। প্রথমে ২ জন, ১০ জন এবং পরে ১৬ জন দিয়ে কাজ শুরু করি। বর্তমানে ১৫০ কর্মীকে ট্রেইনিং করিয়ে কাজ শিখিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, আমার পণ্য দেশে ও দেশের বাইরে যাচ্ছে। কিন্তু দেশের বাইরে সরাসরি দিতে পারি নাই। ঢাকার বায়ারের মাধ্যমে এই পণ্য বিদেশে বিক্রি করি।
বাড়ির আঙিনায় নারীদের নিয়ে তৈরি করছেন পাট দিয়ে নানান হস্তশিল্প। পাট দিয়ে খেলনা পুতুল, নৌকা ,কলমদানি ও ফুলদানিসহ বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালি পণ্য তৈরি করছেন তারা। আর এই নারীদের অগ্রদূত হচ্ছেন আছিরন। মাত্র ৯ বছর বয়সে বাল্য বিয়ের শিকার হন। এমন কি তার কন্যা সন্তান কোহিনুরেরও বিয়ে হয় সাত বছর বয়সে। মা ও মেয়ের বাল্যবিয়ের ঘটনা তুমুল আলোচনার জন্ম দেয় নব্বইয়ের দশকে। সেই থেকে শুরু-সংগ্রাম। লজ্জা আর চোখের পানি মুছে ঘুরে দাঁড়ান আছিরন-কোহিনূর।
রংপুরে পায়রাবন্দের জয়রাম গ্রামের অবহেলিত নারীরা এভাবেই তৈরি করছেন পাটজাত পণ্য। নিজেদের দিন বদল করে স্বাবলম্বী করছেন এখন গ্রামের নারীদের।
শুরুটা ছিল ১৯৯৪ সালে। আছিরন, শাশুড়ির দেয়া একটি সেলাই মেশিন দিয়ে সংগ্রাম শুরু করেন। পরে দুই মেয়েকে নিয়ে লেগে পড়েন পাটের হস্তশিল্পের পণ্য তৈরির কাজে। অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে আসেন অন্য নারীরা। তাদের প্রশিক্ষিত করার দায়িত্ব নেন আছিরন। গড়ে তুলেন ‘অনেক আশা কুটির শিল্প’ নামে প্রতিষ্ঠান। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন দেড় শতাধিক নারীর জীবনমান বদলে দিয়েছেন এই সংগ্রামী মহিয়সী।
আত্মপ্রত্যয়ী আছিরন তার এই আয় দিয়ে স্বামীকে করে দিয়েছেন মুদির দোকান। বাড়ির পাশে শোরুম খুলে নিজেও সম্মানের সাথে ব্যবসা করছেন।
আছিরনের মেয়ে বলেন, আমি দীর্ঘদিন পাটের কাজের সঙ্গে জড়িত। পাটের কাজ করতে ভালো লাগে। বাসায় বসে কাজ করা যায়। এখান থেকে আমাদের অনেক আয় উন্নতি হয়েছে।
আছিরনের মতো নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে জয়িতা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া ও সার্বিক সহযোগিতার কথা জানান রংপুর বিভাগীয় কমিশনার সাবিরুল ইসলাম।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার সাবিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রতিটি বিভাগে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় ইতোমধ্যে ঋণ প্রকল্প কর্মসূচি চলছে এবং তাদের প্রকল্পও চলছে। কৃষিক্ষেত্রে যারা এগিয়ে আসতে চান তাদের জন্য কৃষি ঋণের স্থান কিন্তু আমাদের এখানে রয়েছে। এজন্য আমরা সকলকে বলতে চাই সরকার ঋণের সুযোগ রেখেছে। সুতরাং তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, জয়ীতা আগ্রগতির ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গ অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। উত্তরবঙ্গের ঘরে এবং মাঠে মাঠে বেগম রোকেয়ার মতো আরও অনেক রোকেয়া কাজ করে যাচ্ছে তাই উত্তরবঙ্গ আগের অবস্থা থেকে অনেক এগিয়ে এসেছে। বিশেষত রংপুর বিভাগ একটি উন্নয়নের মডেল হিসেবে পরিণত হতে পারে।
‘অনেক আশা কুটির শিল্প’ নামে আছিরন নেছার এই প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪৬ জন নারী কর্মীর। যাদের প্রত্যেকের স্বপ্ন গ্রামীণ নারীদের কল্যাণ করা। বিলুপ্ত প্রায় এই পাটপণ্য তৈরি করে অত্র এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে বলে ধারণা স্থানীয়দের ।