আন্তর্জাতিক, ভারত

আরও একটি মসজিদকে মন্দির ঘোষণা ভারতের!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

শুক্রবার ২২শে মে ২০২৬ ০৮:৫৯:৩৫ পূর্বাহ্ন
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ধার শহরের ঐতিহাসিক ‘কামাল মাওলা মসজিদ’ বা ভোজশালা কমপ্লেক্স নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের পর এটিকে হিন্দু মন্দির হিসেবে রায় দিয়েছেন রাজ্যের হাইকোর্ট। এরপরই কমপ্লেক্সটিতে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। শুক্রবারের (১৫ মে) ওই রায়ের পর রবিবার (১৭ মে) থেকে ১৩-১৪ শতকের এই প্রাচীন মসজিদ এলাকাটি কট্টর হিন্দুত্ববাদের প্রতীক গেরুয়া পতাকায় ছেয়ে গেছে। সেখানে কড়া পুলিশি পাহারায় দেবীর একটি অস্থায়ী মূর্তি স্থাপন করে ধর্মীয় সংগীতে উল্লাসে মেতেছেন কট্টরপন্থী হিন্দু যুবকেরা।

এই ঘটনা ৭৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিকের জন্য এক চরম আঘাত। গত ৫০ বছর ধরে তিনি এই মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাঁর দাদা হাফিজ নাজিরুদ্দিন ১৯৪৭ সালের আগে থেকেই এখানে ইমামতি করতেন। বেদনাহত কণ্ঠে রফিক বলেন, ‘শুক্রবার পর্যন্ত মসজিদটি আমাদের ছিল, আজ আর নেই। এমন কিছু ঘটতে পারে, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।’

 

মূলত ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিক থেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মসজিদটির স্থানে মন্দির থাকার দাবি তুলে আসছিলেন। ২০০৩ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) এক চুক্তির ভিত্তিতে সেখানে প্রতি মঙ্গলবার হিন্দুরা পরিদর্শন ও শুক্রবার মুসলিমরা নামাজ আদায়ের সুযোগ পেতেন। তবে মন্দির দাবির এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুই বছর আগে এএসআই সেখানে একটি জরিপ চালায়। ওই জরিপের ওপর ভিত্তি করেই হাইকোর্ট কমপ্লেক্সটিকে জ্ঞান ও বাণীর দেবী ‘বাগদেবী’র মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি মুসলিমদের আবেদন খারিজ করে তাঁদের অন্য জায়গায় মসজিদ নির্মাণের জন্য বিকল্প জমির আবেদনের সুযোগ রেখেছেন আদালত।

 

মামলার হিন্দু পক্ষ রায়টিকে ‘ঐতিহাসিক’ বললেও মুসলিম পক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার কথা জানিয়েছে। মুসলিম পক্ষের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি এই রায়কে ত্রুটিপূর্ণ এবং ভারতের ‘উপাসনালয় আইন, ১৯৯১’-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ১৯৩৫ সালের সরকারি গেজেটে জায়গাটিকে মসজিদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও আদালত তা আমলে নেননি। এছাড়া ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ‘বাগদেবী’ বা ‘অম্বিকা’র যে মূর্তিটিকে মন্দিরের অংশ বলে দাবি করে দেশে ফেরানোর কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ ১৮৭৫ সালের ঐতিহাসিক নথিপত্র অনুযায়ী ওই মূর্তি ধার শহরের ‘সিটি প্যালেস’ থেকে উদ্ধার হয়েছিল, কামাল মাওলা মসজিদ থেকে নয়।

 

ইতিহাসবিদ ও ভারতীয় উপমহাদেশবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অড্রে ট্রুশকেও আদালতের রায়ের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত এএসআইয়ের জরিপকে নিম্নমানের ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ভারতে মসজিদগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর এই প্রবণতা হিন্দু জাতীয়তাবাদের গভীরে প্রোথিত ইসলামভীতির অংশ এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে হয়রানি করার একটি কৌশল।

 

ভারতে প্রাচীন মুসলিম স্থাপনাগুলোকে মন্দির দাবি করার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী কর্মীরা এ ধরনের দাবিতে আরও উৎসাহিত হয়েছেন। এমনকি সমাধিসৌধ তাজমহলের নিচেও মন্দিরের অস্তিত্ব খোঁজা হয়েছে।

 

সার্বিক এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি অভিযোগ করেন, এএসআই এখন হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের এই রায়ের সঙ্গে ২০১৯ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসসংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের যোগসূত্র রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপাসনালয়গুলো চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

 

সূত্র: আলজাজিরা
 

ডিবিসি/এফএইচআর

আরও পড়ুন