ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। সম্প্রতি জার্মানির লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার বাইরের চত্বরে প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থী সমবেত হয়ে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধের দাবিতে ভোট দিয়েছেন। হলুদ কার্ড হাতে তোলা শিক্ষার্থীদের এই রায় ছিল প্রায় সর্বসম্মত।
মার্চ মাস থেকে জার্মানিতে ফিলিস্তিনপন্থী যে সংহতির ঢেউ শুরু হয়েছে, লিপজিগের এই ঘটনা তারই সর্বশেষ রূপ। এর আগে বার্লিন ও ডুসেলডর্ফের অন্তত তিনটি ছাত্র সংসদ একই ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধাপরাধ এবং তাদের সরকারের অন্যান্য নিপীড়নমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। লিপজিগের ‘স্টুডেন্টস ফর প্যালেস্টাইন’-এর ২২ বছর বয়সী সদস্য অরল্যান্ডো বেকার জানান, লিপজিগের পাঁচটি ইসরায়েলি অংশীদার বিশ্ববিদ্যালয় মূলত ইসরায়েলি সামরিক কাঠামোর অপরিহার্য অংশ। তারা অস্ত্র ও নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি করে এবং ক্যাম্পাস থেকে সামরিক বাহিনীর জন্য সদস্য নিয়োগ দেয়। এমনকি প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার নামে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার এবং জাতিগত নিধনের পক্ষে সাফাই গাওয়ার অভিযোগও তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। এই দাবির সপক্ষে শিক্ষার্থীরা ১,৩০০ স্বাক্ষর সংগ্রহ করে একটি সাধারণ সমাবেশের ডাক দিলেও, ‘একাডেমিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার’ অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের লেকচার হল ব্যবহারের অনুমতি বাতিল করে দেয়।
এর আগে মার্চ মাসে বার্লিনের বেসরকারি হার্টি স্কুলের ছাত্র সংসদ জার্মানির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিডিএস (বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস) আন্দোলনকে সমর্থন করে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে প্রস্তাব পাস করে। ভোটে ৯০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী এর পক্ষে রায় দেন। তবে হার্টি স্কুল কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে ছাত্র সংসদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ তাদের ভিসা বাতিল, চাকরির সুযোগ নষ্ট হওয়া এবং তহবিল কমানোর মতো ভয়ভীতি দেখিয়েছে। একপর্যায়ে অনাস্থা ভোটে হেরে পদত্যাগ করে ছাত্র সংসদ। রুশ পরিবেশকর্মী ও শিক্ষার্থী আরশাক মাকিচিয়ান এই পরিস্থিতিকে ‘রাশিয়ার মতো দমবন্ধ করা পরিবেশ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
জার্মানিতে ইসরায়েলকে সমর্থন করা আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্বার্থ বা ‘স্ট্যাটসরেজন’ হিসেবে বিবেচিত হয়। বার্লিনের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির (টিইউ) গবেষক পিটার উলরিখ জানান, হলোকাস্টের ইতিহাসের কারণে রাজনৈতিকভাবে ইসরায়েলকে প্রায় ‘পবিত্র’ হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলা বা বিক্ষোভ করার ওপর রাষ্ট্র কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। এমনকি হার্টি স্কুলের এক ইহুদি শিক্ষার্থী জানান, ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়ালে তাদেরকেও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং একে অ্যান্টি-সেমিটিজম বা ইহুদিবিদ্বেষ বলে ভুল আখ্যা দেওয়া হয়।
ফিলিস্তিনপন্থী এই আন্দোলন দমন করতে জার্মানিতে নিয়মিত পুলিশি হস্তক্ষেপ, অনুষ্ঠান বাতিল এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটি এবং হামবোল্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের সহিংস হামলা, গ্রেপ্তার এবং কয়েকজনকে দেশ থেকে বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে। অথচ, ইউক্রেন যুদ্ধের পর জার্মান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে রুশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছিল। বার্লিন টিইউ-এর গবেষক উফা জেনসেন এই দ্বৈতনীতির সমালোচনা করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে এত ভয়াবহ সংঘাতের পরও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে জার্মানির অবস্থান একেবারেই ভিন্ন, যা মূলত ইসরায়েলের প্রতি তাদের নিঃশর্ত রাজনৈতিক সমর্থনেরই প্রতিফলন। প্রশাসন কঠোর হলেও, জার্মান শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করছে।
সূত্র: আলজাজিরা
ডিবিসি/এফএইচআর