বর্তমানে নিউজ মিডিয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সাথে তুলনা করতে গিয়ে প্রায়ই ভিয়েতনামের নাম আনা হয়। বিশেষ করে, তৈরি পোশাক রপ্তানির বাজারে ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশ যথেষ্ট এগিয়ে থাকলেও বাস্তবে ভিয়েতনামের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সক্ষমতা নিয়ে খুব একটা আলোচনা করা হয় না। অথচ ১৯৭৫ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করে ভিয়েতনাম আজ একটি শক্তিশালী উন্নয়নশীল দেশের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রকাশিত গত এপ্রিল ২০২৬-এর হিসেব অনুযায়ী, ভিয়েতনামের নামমাত্র জিডিপির আকার ৫২৭.২৭ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু আয় প্রায় ৫,১২০ ডলার।
২০২০-২০২২ সময়ে ভয়াবহ কোভিড-১৯ মহামারির বিরূপ প্রভাব সত্ত্বেও ভিয়েতনামের জাতীয় অর্থনীতি মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। সারা বিশ্বে চলমান অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও গত ২০২২ সালে ভিয়েতনামের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ৮.০২%। যদিও আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালে তাদের প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭.১%।
২০২৫ সালে ভিয়েতনামের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৩০.০৫ বিলিয়ন ডলার। ওই বছর দেশটি রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ৪৭৫.০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৭% বেশি। একই সময়ে তারা সারা বিশ্ব থেকে প্রায় ৪৫৫.০১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। সে হিসেবে ২০২৫ সালে ভিয়েতনাম প্রায় ২০.০৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করে।
ভিয়েতনামের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (এসবিভি)-এর দেওয়া হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৮৪ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট বৈদেশিক ঋণ ও দায়ের পরিমাণ ছিল ১৩২.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে ভিয়েতনাম মোট ৩৮.৪২ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ অর্জন করে।
এদিকে, বিশ্বের কম মূল্যমানের মুদ্রাগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের ডং অন্যতম। ২৩ মে ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, এক ডলারের বিপরীতে বিনিময় হার ছিল ২৬,৩৬৪.৯৮ ডং। গত এপ্রিল মাসে দেশটির সার্বিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল প্রায় ৫.৪৬%। আর ২০২৫ সালের পুরো বছর ধরে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় দেড় থেকে দুই শতাংশ।
১৯৭৬ সালের দিকে ভিয়েতনাম কৃষিনির্ভর অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রাপ্তি এবং একটি রপ্তানিমুখী শক্তিশালী উৎপাদন শিল্পখাত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কম শ্রম ও উৎপাদন খরচ এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ভিয়েতনামকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পরিশেষে বলা যায়, ভিয়েতনামের এই টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বিশ্বের স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হয়েও ধারাবাহিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কম শ্রম খরচ ও কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে তারা কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তুলেছে, যা বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
লেখক: সিরাজুর রহমান, শিক্ষক ও লেখক।
ডিবিসি/আরএসএল