মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জির হাত থেকে দলের রাশ এরই মধ্যে অনেকটা ছিটকে গেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীক ও বিপুল সম্পত্তির অধিকারও কি তাঁদের হাতছাড়া হতে চলেছে?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে তিন ভাগ হয়ে গেছে। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনই মমতা ব্যানার্জীর হাত ছেড়ে বিদ্রোহী হয়ে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণার পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন। অন্যদিকে, দলের ৪১ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়ে সরাসরি বিজেপিকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছেন। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন এই বিদ্রোহী সাংসদরা দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভুপেন্দ্র ইয়াদভের সঙ্গে দেখাও করেছেন, যেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।
তৃণমূলের এই ভাঙনকে অনেকেই ২০২৩ সালে মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে শিবসেনার রাশ একনাথ শিন্ডের কাছে চলে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে ভারতের রাজনৈতিক দল ভাঙার আইনে তৃণমূলের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ‘সিম্বলস অর্ডার ১৯৬৮’–এর ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দলের ভাঙনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতীকের প্রকৃত দাবিদার বেছে নেয়। ১৯৭১ সালের 'সাদিক আলি বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন' মামলার রায় অনুযায়ী, দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ, বিধায়ক ও সাংগঠনিক নেতা যে পক্ষে থাকেন, সেটিই প্রতীকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।
ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসার মতে, দলের কোনো অংশ থেকে 'ডিসপিউট' দাবি করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হলেই কেবল কমিশন তা খতিয়ে দেখতে পারে। তবে এখনও তৃণমূলের কোনো অংশই নিজেদের 'আসল তৃণমূল কংগ্রেস' দাবি করে কমিশনের দ্বারস্থ হয়নি। যদি কোনো বিদ্রোহী অংশ কমিশনের দ্বারস্থ হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারে, তবে শুধু প্রতীকই নয়, তৃণমূলের বিপুল সম্পত্তিরও অধিকার হারাতে পারেন মমতা। ২০২৪-২০২৫ সালের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, তৃণমূলের মোট সম্পত্তির পরিমাণ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা তাদের ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্পদশালী দলে পরিণত করেছে।
তৃণমূলের এই ভাঙনের প্রকৃতিও কিছুটা ব্যতিক্রমী। বিদ্রোহী বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী দল ছাড়লেও তিনি এখনও বিজেপি বিরোধী অবস্থানে অনড়। এমনকি দিল্লিতে সাংসদদের বিজেপিকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে তিনি জানিয়েছেন, বিজেপির সুবিধা হয় এমন কোনো কাজ তাঁরা করবেন না। অন্যদিকে, সাংসদদের বিদ্রোহী ব্লকের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। ফলে তৃণমূল কার্যত তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা ভারতের রাজনীতিতে বিরল। এর আগে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও এনসিপি, তামিলনাড়ুতে এআইএডিএমকে এবং কংগ্রেসের মতো দলে ভাঙন দেখা গেলেও তৃণমূলের এই ত্রিমুখী বিভাজন এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
ডিবিসি/এফএইচআর