• সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯
  • সকাল ৮:৩৭

সমালোচিত বক্তব্যকে 'স্লিপ অব টাং' আখ্যা দিলেন তাহেরী

সমালোচিত বক্তব্যকে 'স্লিপ অব টাং' আখ্যা দিলেন তাহেরী

ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেয়ায় অভিযুক্ত মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরী তার নানান সমালোচিত বক্তব্যকে 'স্লিপ অব টাং' আখ্যা দিয়ে বলেছেন, তিনি ওয়াজে আর কখনও এসব কথা বলবেন না। ভাইরাল হওয়া নানা বিষয় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে মামলা এবং সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে  ডিবিসি নিউজকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরী।

সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ওয়াজ শুনতে আসা লোকদের চাঙ্গা করতেই মাঝে-মধ্যে এমন রসিকতা করতেন।

শুরুতেই মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরীকে প্রশ্ন করা হয়, মামলার এজহারে যে ওয়াজগুলোকে কেন্দ্র করে মামলা করা হয়েছে এই মামলায় ধর্ম বিরোধী বা ইসলাম ধর্মের অবমাননা হয় এমন কিছু আছে কি না? জবাবে তাহেরী বলেন, এটা একটি প্রতিহিংসার মামলা।

ডিবিসি নিউজ: ওয়াজে আপনি যে ধরনের জিকির করেন বা বাক্য ব্যবহার করেন সেগুলো কতখানি যৌক্তিক?

তাহেরী: আমরা দুই আড়াই ঘন্টা একটানা ওয়াজ বা বয়ান করি। সেখানে দু-একটি কথা আমরা পরিস্থিত, উপস্থিতি বা আবেগতাড়িত হয়ে বলি। এটা অনেক সময় স্লিপ অব টাং হয়ে যায়। আর ওয়াজের যে অংশগুলো উল্লেখ করা হয়েছে বা ভাইরাল হয়েছে সেগুলো আমরা মজা বা ফান করেই বলি। দুই আড়াই ঘন্টার বক্তব্যের মধ্যে একটু ভিন্ন কথা হতেই পারে। এ নিয়ে যে মামলা হতে পারে, এটা দুঃখজনক।

ডিবিসি নিউজ: ওয়াজের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে ফান করা কতখানি যৌক্তিক বা এটা আসলেই করা যায় কি না?

তাহেরী: ওয়াজের ভিতর আমি একা না অনেকেই ফান করে অনেক কিছুই করে। অনেক বক্তার ওয়াজেই কোরআন এবং সুন্নাহ বিরোধী বা সাংঘর্ষিক এমন অনেক কথার রেকর্ড আমার কাছে আছে। তাদের কারও বিরুদ্ধে মামলা হলো না। কিন্তু, আমার এই বাংলা কথাগুলো নিয়ে মামলা হলো, এটা খুব দুঃখজনক।

আর যে ফান, কোরআন এবং সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেটা অগ্রহণযোগ্য। আর যেটা সাংঘর্ষিক না সেটা কোরআন এবং সুন্নাহ বিরোধী হতে পারে না।

ডিবিসি নিউজ: যেভাবে আপনি ওয়াজ করেন সেটা ওয়াজের সঠিক নিয়ম কি না?

তাহেরী: আমি ১৭ বছর ওয়াজ করি। তো আমার ওয়াজের ভিতর কি আমি সব ফান বা মজাই করি, ওয়াজ কি করিনা। এই ১৭ বছরের ওয়াজে কি কোরআন ও সুন্নাহ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এটা কি তাদের চোখে পড়ে না।

মানুষ বক্তব্য দিতে গেলে ভুল হতে পারে, স্লিপ অব টাং হতে পারে। এগুলোকে স্বাভাবিকভাবে না বলে, একটা মামলা করতে হবে, এটিও ধর্মের অবমাননা। এগুলোকে যদি অবমাননা বলা হয় সেটিও অপরাধ।

ডিবিসি নিউজ: আপনার বেশিরভাগ ওয়াজেই জিকির, গান বা আপনি যেভাবে কথা বলেন তার ধরন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। যদি ভুল করেই হয়ে থাকে তাহলে একই ভুল একজনের বারবার হতে পারে কি না?

তাহেরী: আমি ১৭ বছর বয়ান, ওয়াজ করি দুই একটা কথা ভুল হতেই পারে। এই কথাগুলো না বললে কি আমি ওয়াজ করতে পারব না। আমিও কিন্তু কিছু পড়াশোনা করেছি। ইচ্ছা করলে এগুলো বাদ দিয়েও ওয়াজ করতে পারব। অনেক সময় আবেগতাড়িত হয়ে অনেক কথা বলা হয়ে যায়, সেগুলো নিয়ে এত মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়নি। এসব নিয়ে এত আলোচনা, এটা ঠিক না। বরং আমি মনে করি আমার ওয়াজের বা বক্তৃতার মধ্যে থেকে ৩০ সেকেন্ডের ছোট্ট একটি অংশ কেটে নিয়ে যারা ট্রল করে বা কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ভাইরাল করে তাদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

আর যেহেতু মানুষের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে সেহেতু আমরা নিজেরাও নিজেদের সংযত করব। নিজেকে সংশোধন করে ধৈর্য্য নিয়ে কথা বলব।

ডিবিসি নিউজ: আপনি তো নিজেই ওয়াজের মধ্যে বলেছেন ডানে-বামে কথা না বললে সবাই ঝিমিয়ে পড়ে, তাহলে সেই ডানে-বামের কথা কি এগুলোই?

তাহেরী: যখন দীর্ঘ সময় ওয়াজ করা হয় তখন অনেকের মধ্যেই ঝিমুনি চলে আসে। ঝিমুনি কাটানোর জন্যই বসেন বসেন, বসে যান, কোনো হৈ চৈ আছে- পরিবেশটা সুন্দর না এগুলো তারই অন্তর্ভুক্ত।

ডানে-বামে বলতে আমার নীতি-নৈতিকতা যে অন্য কোনো দিকে ডাইভার্ট করব,এটা অসম্ভব। ধারণা করে অনেক কথা বলা যায় যেটা প্রতিহিংসা থেকেই হয়।

ডিবিসি নিউজ: ওয়াজের বিষয়টি যেহেতু ধর্মীয় এবং স্পর্শকাতর বিষয় তাই তরুণ সমাজে বা ওয়াজে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কি না বা আপনি কি মনে করেন?

তাহেরী: দেখুন আপনাকে আমি আগেই বলেছি আবেগতাড়িত হয়ে বা স্লিপ অব টাং হয়ে যায়। এ বিষয়ে নিজেকে সংযত করব। আলেম ওলামারা এখনও গ্রামগঞ্জে ওয়াজ মাহফিল করছে বলেই যাত্রার মতো অসামাজিক কার্যকলাপ ওপেনে হচ্ছে না। অনেক ধরনের বেহায়াপনা ওয়াজের কারণেই বন্ধ আছে। আলেম ওলামাদের কারণেই বাংলাদেশ এখনও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে। কিছু সংখ্যক মানুষ আমার আড়াই ঘন্টার বক্তব্য দেখল না, তারা ৩০ সেকেন্ডের বক্তব্য নিয়ে হৈ চৈ শুরু করল। আমার বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করল। এরা কখনই ইসলামের ভালো চায়নি।

ডিবিসি নিউজ: আপনার কাছে একটা সত্যি কথা জানতে চাই। আপনার ওয়াজের মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে ভাইরাল হয়েছে ধুমপানের দোয়া। আপনার কাছে কেউ একজন ধুমপানা বা বিড়ি টানার দোয়া জানতে চেয়েছিল- একজন হুজুরের কাছে কেউ এটা জিজ্ঞেস করতে পারে কি না বা আপনি যেটা বলেছিলেন সেটা ঠিক ছিল কি না?

তাহেরী: এটা জানতে চেয়েছিল সত্যি। তবে, আমি যখন কুমিল্লার দাউদকান্দিকে চাকরি করতাম তখন একজন মজা করে জানতে চেয়েছিল। ওই সময় আমি তাকে বলেছিলাম, কোরআন-সুন্নাহর বাহিরে যুক্তি দিয়ে যত দলিল উপস্থাপন করা হোক না এটা কখনও গ্রহণযোগ্য হবে না। এগুলো আলোচনায় আসলো না, আসলো শুধু বিড়ি টানার দোয়া।

আর আমার গাওয়া গানগুলো নিয়ে দেখলাম অনেকেই নিউজ করেছে। কিন্তু, এর আগের বা পরের ঘটনাগুলোর বর্ণনা করেছি তা উল্লেখ নেই শুধু গানগুলোই আছে। আমি অলরেডি পঞ্চাশ থেকে ষাটজন বক্তার যে বক্তব্যগুলো ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেগুলোর সব রেডি করেছি। তবে, আমি মনে করব, ওলামাদের যদি কোনো ভুল হয়ে যায়। তাহলে তা সংশোধনের নজরে দেখাই ভালো।

ডিবিসি নিউজ: এখন আপনি আইনি লড়াই করছেন কি না?

তাহেরী: মামলা যেহেতু হয়েছে, শুনানি হওয়ার কথা। কিন্তু হয়েছে কি না তা জানিনা। এখন আদালত যদি মামলা আমলে নেন তাহলে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আইনি প্রক্রিয়ায় জবাব দিতে হবে।

কেউ যদি দোষী না হলেও তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মামলা করে, তাহলে সে যদি মামলার জবাব না দেয় তাহলে মিথ্যাটা সত্য হয়ে যায়। এখন আইনি প্রক্রিয়ায় মাধ্যমেই এর জবাব দিতে হবে।

ডিবিসি নিউজ: আপনার জন্য শেষ প্রশ্ন, আপনি বলেছিলেন ওয়াজ মাহফিলের কারণে যাত্রা বা কনসার্ট আর হয় না। তাই যাত্রা বা কনসার্টের থেকে তরুণ সমাজকে ফিরিয়ে আনার জন্যই কি আপনি এমন রসালো কথা ব্যবহার করেন?

তাহেরী: যে গানগুলোর কথা বলা হচ্ছে সেগুলো কিন্তু অশালীন কোনো কথা না। আমি কোরআন-সুন্নাহ নিয়েই কথা বলি।

ডিবিসি নিউজঃ সবশেষ আপনার কাছে জানতে চাই, আপনার ওয়াজ নিয়ে অনেকেই মজা পায়। তরুণরা হাসাহাসি করে, এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

তাহেরী: এটা কি শুধু আমার একার ওয়াজেই হয়। নাকি অন্যদের ওয়াজেও হয়। আমি কি একাই অপরাধী। মানুষকে যখন সমালোচনার চোখে দেখা হয়, তখন সে বেশি ভাইরাল হয়। আমার ক্ষেত্রেও এটাই হয়েছে। তবে, আমার অন্তরের খবর আল্লাহ ভালো জানেন, আমি কি মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য মজা করেছি নাকি মানুষের মনকে সহজ করার জন্য বা তন্দ্রাভাব কাটানোর জন্যই বলেছি সেটা সৃষ্টিকর্তা ভালো জানেন।

ডিবিসি নিউজ: আপনাকে ধন্যবাদ আমাদের সময় দেয়ার জন্য। ভালো থাকবেন।

তাহেরী: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

ডেস্ক
ডিবিসি নিউজ ডেস্ক
ডিবিসি নিউজ
প্রকাশিতঃ ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আপডেটঃ সোমবার, ১৪ই অক্টোবর, ২০১৯ সকাল ০৭:০৩


সর্বশেষ

আরও পড়ুন