রবিবার হরমুজ প্রণালীতে একটি কন্টেইনার জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী দেশটির ওপর নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান আবারও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে এবং একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশেও নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গত কয়েকদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর শুরু হওয়া যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছিল। তবে যুদ্ধবিরতি শেষ হলেও ট্রাম্প আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন বলে জানা গেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কয়েকটি জাহাজ অননুমোদিত রুট দিয়ে যাওয়ার সময় এবং বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার পর তারা একটি জাহাজে সতর্কতামূলক গুলি বর্ষণ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। তেহরান হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এই ঘটনার পর মার্কিন কোনো আগ্রাসন বা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের চরম জবাব দেওয়া হবে এবং অঞ্চলের নতুন মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আক্রান্ত জাহাজটিকে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ 'এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। হামলায় জাহাজটির ইঞ্জিন রুম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একজন বেসামরিক ক্রু সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানিয়েছে, ওমানের পূর্বে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ওই জাহাজের ক্রুরা সেটি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং বর্তমানে তারা লাইফবোটে অবস্থান করছেন। এর পরপরই ইরানের বিভিন্ন বন্দর নগরীতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জানায় যে তারা মার্কিন মিত্র জর্ডানের একটি ঘাঁটিতে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার এবং ড্রোন হ্যাঙ্গার ধ্বংস করেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে। কাতারও একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর দাবি করেছে, যার ফলে দোহার আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং বাহরাইনে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। এই যুদ্ধের ফলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। ইরানের এই কার্যকর অবরোধের কারণে জ্বালানির দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্পের জন্য একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেভল্যুশনারি গার্ডস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, এই অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপের অবসান না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে। সেন্টকম জানিয়েছে, ইরান হুশিয়ারি দেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর ট্রাম্পের নির্দেশে তারা এই পাল্টা হামলা শুরু করে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তেহরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে যে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত থাকবে এবং তারা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো বন্ধ করবে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, গত সপ্তাহে তিনটি কাতারি ও সৌদি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলের লাইসেন্স বাতিল করে এবং ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়, যার জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করেছিল।
সূত্র: রয়টার্স
ডিবিসি/এসভিএন