দ্য টেলিগ্রাফ নিউজ এজেন্সির দেওয়া তথ্যমতে, রাশিয়ার সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল আলাউদিনভ স্পষ্ট বলেছেন যে, ইউক্রেন এখন পশ্চিমা বিশ্বের নতুন অস্ত্র পরীক্ষার এক ‘টেস্টিং গ্রাউন্ড’-এ পরিণত হয়েছে। বাস্তবে শুধু ইউক্রেন নয়, ইতিহাসের প্রতিটি বড় যুদ্ধক্ষেত্রেই অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের নতুন প্রযুক্তির অস্ত্র পরীক্ষার উন্মুক্ত গবেষণাগার বানাতে কখনো কুণ্ঠিত হয়নি।
২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, তুরস্ক, ইসরায়েল ও জার্মানি তাদের শতাধিক ডিফেন্স সিস্টেম ও প্রাণঘাতী অস্ত্রের কার্যকারিতা যাচাই করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। অন্যদিকে, একই সময়ে রাশিয়া, ইরান ও চীনও তাদের নতুন সামরিক প্রযুক্তি সরাসরি ফ্রন্টলাইনে পরীক্ষার বিশেষ সুযোগ পেয়েছে।
প্রতিটি মিসাইল হামলা, প্রতিটি ড্রোন অভিযান হয়ে উঠেছে একটি ‘লাইভ ডেমো’-যেখানে গতি, নির্ভুলতা ও ধ্বংসক্ষমতা নির্মমভাবে প্রতিনিয়ত মাপা হচ্ছে। কিন্তু এই অশুভ ও অতিলাভজনক অস্ত্র প্রতিযোগিতার বাস্তব শিকার হচ্ছে যুদ্ধকবলিত শহর ও জনপদের সাধারণ মানুষ। ২০২২ সাল থেকে চলমান ভয়াবহ এই যুদ্ধে ইউক্রেনের হাজার হাজার আবাসিক ভবন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও স্কুল-হাসপাতাল ধ্বংস হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা উদ্বাস্তু হয়েছেন। আফগানিস্তান ও সিরিয়ার যুদ্ধেও ঠিক একই চিত্র ফুটে উঠেছে।
অথচ প্রভাবশালী দেশগুলোর কাছে এই মানবিক বিপর্যয় কখনো অগ্রাধিকার পায়নি। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিপক্ষকে দুর্বল কিংবা ধ্বংস করা এবং এর পাশাপাশি নিজেদের অস্ত্র প্রযুক্তির সাফল্যকে বৈশ্বিক অস্ত্র বাজারে রপ্তানিযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা। প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত্যু ও ধ্বংস আজ যেন অস্ত্র ব্যবসার প্রমোশনাল ভিডিও। অস্ত্রের কার্যকারিতা দেখানোর মাধ্যমে তারা শত বিলিয়ন ডলারের বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
আর এই অস্ত্র পরীক্ষা ও ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবন, যারা হতাশাজনকভাবে ক্রমশ পরিণত হচ্ছে অস্ত্র পরীক্ষার এক অমানবিক উপকরণে। আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় দুই দশক ধরে যে প্রক্রিয়া চলেছে, ইউক্রেন সেটির আরও ভয়াবহ ও আধুনিক সংস্করণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই যুদ্ধে রাশিয়া নিজেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাস্তবে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বর্তমানে বিশ্বের ৯টি দেশের কাছে প্রায় ১২ হাজারের অধিক পারমাণবিক অস্ত্র মজুত রয়েছে। কিন্তু যদি এই ক্ষমতা শুধু এক বা দুটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত হতো, তাহলে তারা দ্বিধা না করেই সেটি অন্য দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবহার করত- ঠিক যেমনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে করা হয়েছিল। সে সময় মানুষকে ‘পরীক্ষামূলক’ লক্ষ্যবস্তু বানাতে তাদের কোনো দ্বিধা ছিল না।
এদিকে, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI), ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (IISS)-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২.৬৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তার আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। আর চলতি ২০২৬ সালে তা হয়তো প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বিশ্বের পেছনের সারির ১০০টি দেশের মোট জিডিপি আকারের চেয়েও বেশি হতে পারে।
পরিশেষে, একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র পরীক্ষার এই ভয়ংকর প্রতিযোগিতা মানবতার জন্য এক মহাবিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রকে টেস্টিং ল্যাবে রূপান্তরিত করার অর্থ হলো- সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলা এবং সমগ্র জনপদকে ধ্বংসের খাতায় নাম লেখানো। যতদিন না শক্তিধর দেশগুলো এই প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াবে এবং মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেবে, ততদিন প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্র নতুন নতুন প্রাণঘাতী অস্ত্রের পরীক্ষাগার হয়ে টিকে থাকবে। আর তার মূল্য চোকাতে হবে সমৃদ্ধ জনপদ ধ্বংস এবং সাধারণ মানুষের জীবন দিয়ে।
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেটে প্রাপ্ত উন্মুক্ত উৎস থেকে তথ্য সংগৃহীত ও নিজস্ব বিশ্লেষণ।
লেখক: সিরাজুর রহমান, শিক্ষক ও লেখক, বাংলাদেশ।
ডিবিসি/ এসভিএন