বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান প্রবাসী কমিউনিটির অব্যাহত দাবীর মুখে দেশটির ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ প্যারামাটা ক্যাম্পাসে স্থাপিত শেখ মুজিবুর রহমানের একটি আবক্ষ মূর্তি অপসারণ করেছে। গত বৃহস্পতিবার (২০শে মার্চ) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে, তারা মূর্তিটি আইন অনুষদের সামনের উন্মুক্ত স্থান থেকে সরিয়ে ফেলেছে।
আধুনিক যুগে পৃথিবীর সব দেশে স্বৈরশাসকদের মাঝে নিজেদের মূর্তির প্রতি এক ধরণের বিকৃত ঝোঁক দেখা যায়। স্ট্যালিন, মুসোলিনি, হিটলার, ফ্রান্কো, সাদ্দাম, গাদ্দাফী, ইদি আমিন, মবুতু, সুহার্তো, মার্কোস, পিনোশে এই সকল স্বৈরাচারীরা এবং তাদের অনুসারীরা স্থাপত্যের নামে মূর্তি বানানোর মাধ্যমে জনমানসে এসব স্বৈরাশাসকদের দখলদারিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এদের প্রত্যেকেরই মূর্তিগুলোর পরিণতি হয়েছে ধ্বংস ও ভাংচুরের মাধ্যমে। অধিকার ও মুক্তির দাবিতে ফুঁসে উঠা জনগণের ক্রোধের শিকার হয়েছে প্রতিটি স্বৈরশাসকের মূর্তি।
বিগত ষোল বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা আওয়ামী লীগ দেশের রাষ্ট্রীয় অর্থ এবং জনগণের টাকা খরচ করে দেশের ভেতরেই ১২০০ থেকে ১৫০০ শত মুজিব মূর্তি স্থাপন করেছিলো। ছোট থেকে বড় বিভিন্ন আকৃতির ও উদ্ভট চেহারার এসব মূর্তি স্থাপন করতে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ ও দুর্নীতি করেছিলো।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট গণবিপ্লবের পর বাংলাদেশে শেখ মুজিবের মূর্তিগুলোকে মানুষ ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম স্বৈরশাসক, সদ্য স্বাধীন একটি দেশে গুম-খুন-নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের জনক, একদলীয় শাসনের প্রবর্তক এবং দুর্নীতির চুড়ান্ত সীমায় গিয়ে পুরো দেশের মানুষকে দুর্ভিক্ষের কবলে নিক্ষেপ করা পতিত শাসক মুজিবের মূর্তিগুলোকে বাংলাদেশের মানুষ ভেঙে চুরে সমান করে দিয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ফ্যাসিবাদের চর্চা করা আওয়ামী লীগের জনক এই লোকের ঘৃণ্য স্মৃতি বত্রিশ নম্বরের বাড়ি পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতা উৎখাত করে দিয়েছে।
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আওয়ামী লীগের লোকজন বাংলাদেশের বাইরে অন্যান্য দেশেও মুজিবের মূর্তি স্থাপন করেছিলো। ইংল্যান্ডের ইস্ট লন্ডনে নিজস্ব ও ব্যক্তিগত মালিকানাধীন স্থানে মুজিবের মূর্তি বসিয়েছে আওয়ামী লীগের লোকজন। যুক্তরাস্ট্রের ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে ও ইন্ডিয়ার কলকাতা উপ-দূতাবাসে মুজিবের মূর্তি বসানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে, ফ্রান্সের প্যারিসে এবং তুরস্কের আংকারায় বিভিন্ন স্থানীয় সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে মুজিবের মূর্তি বসানো হয়েছে। প্রতিটি মূর্তির নির্মাণ এবং আনুসঙ্গিক খরচ বাবদ হাতবদল হয়েছে কোটি কোটি টাকা, দুর্নীতি করা হয়েছে তারচেয়েও বেশি। এসব খরচ এসেছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে।
২০১৭ সালে এমনই একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিলো অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থিত ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির প্যারামাটা ক্যাম্পাসে। শেখ মুজিবের এই আবক্ষ মূর্তিটি উদ্বোধন করার জন্য বাংলাদেশ থেকে এসেছিলো তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার সাথে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আওয়ামী রাজনীতির অনুসারী ও সুবিধাভোগী কিছু শিক্ষক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে মুজিবের মূর্তিটি স্থাপন করার জন্য সে সময় একটি চাতুর্যপূর্ণ কৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়। শেখ মুজিবকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক পানি সম্পদ ও নৌ সীমানা সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের পথিকৃৎ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির আইন অনুষদের অধীনে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশেন গভর্নেন্স নামে একটি রিসার্চ সেন্টারের সাথে তাকে সম্পর্কিত করা হয়।
সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করার জন্য দাতা সংস্থা অথবা ব্যক্তিরা কয়েক মিলিয়ন ডলার সীড ফান্ড দিয়ে থাকেন। জনশ্রুতি রয়েছে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও শাসন গবেষণার নামে একটি রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার এ বিশ্ববিদ্যালয়কে সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ডোনেশন হিসেবে দিয়েছিলো। এ কোটি কোটি টাকা লেনদেনের মাঝে নিজেদের বখরা ও কমিশনও নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা, গবেষণা করা এবং স্থানীয় এলাকায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা কিছু বাংলাদেশী লোকজন। এই পুরো তথাকথিত গবেষণা কর্মকাণ্ডের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো অস্ট্রেলিয়ায় শেখ মুজিবের একটি মূর্তি স্থাপন এবং সেই প্রচারণা চালিয়ে বিজয়োল্লাস করা।
পুরো ঘটনায় সবচেয়ে কৌতুককর বিষয় হলো মুজিব-মূর্তিটি স্থাপন করা শেষ হওয়ার পর, আসল উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার পর এবং দেশের মানুষের হাজার কোটি টাকা হাতবদল হওয়ার পর অল্পদিনের মাঝেই সেই তথাকথিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশেন গভর্নেন্স’ বন্ধ করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বেমালুম বাতাসে উবে যায় হাস্যকর সমুদ্রবিজয়ের বায়বীয় আইন গবেষণার কাজকর্ম। তবে মুজিবের মূর্তিকে ঘিরে আওয়ামীদের উৎসব ও নানা গৌরবজনক কর্মকাণ্ড চলমান থাকে।
পরবর্তী বছরগুলোতে সিডনিতে এই মূর্তিকে ঘিরে মুজিববাদীদের নানা আদিখ্যেতা এবং উৎসব দেখা গিয়েছে। ফ্যাসিবাদের অনুসারীরা ‘জাতির পিতার ভাস্কর্যটি কেমন করে আমাদের হলো’, ‘সিডনিতে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ মূর্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসীদের তীর্থ’ ইত্যাদি নানা আবেগমথিত রচনায় তাদের উৎসব ও নানা উদ্ভট কর্মকান্ডের প্রচারণা চালিয়েছে।
২০১৬ সালে যখন মূর্তিটি স্থাপনের পরিকল্পনা শুরু হয় তখন থেকেই অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশীদের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা এর বিরোধীতা করে ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষকে শেখ মুজিব সম্পর্কে তাদের আপত্তির কথা জানায়। কিন্তু রিসার্চ সেন্টারের অর্থ সমাগমের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার ফলে বিপুল আপত্তিতেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কখনো কান দেয়নি। বছরের পর বছর তারা প্রতিটি সংগঠন ও ব্যক্তিকে তাদের অভিযোগের আনুষ্ঠানিক উত্তরে প্রত্যাখ্যান করে করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের পতন ও জনগণের বিপ্লবের পর ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের সাথে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষের বাংলাদেশীরা আবারও এ মূর্তি সম্পর্কে যোগাযোগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির একদল পিএইচডি শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, আইনজীবী এবং সংবাদকর্মীরা আবারও তাদের আপত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। মুজিবের প্রতিষ্ঠিত দল আওয়ামী লীগের পরিচালিত গণহত্যার প্রামাণ্য দলিল সংযুক্ত করে প্রশ্ন তুলেন, গণতন্ত্র ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার স্থান বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে একটি ফ্যাসিবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা স্বৈরাচারী শাসকের মূর্তি থাকতে পারে।
বিস্তারিত ও প্রামাণ্য যুক্তি বিভিন্ন ধাপে সরবরাহ করার পর এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নেয়। দীর্ঘদিন যাবত বিভিন্ন সংগঠনের ক্রমাগত আপত্তিও এক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ এ বছরের ২০শে মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, সকল যুক্তিতর্ক বিবেচনায় আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা মূর্তিটি অপসারণ করেছে। পরদিন গেছে দেখা যায় আগে যেখানে সবুজ ঘাসের লনের উপর মুজিবের আবক্ষ মূর্তিটি স্থাপিত ছিলো তা বেদীসহ সমূলে উৎপাটন করে উঠিয়ে নেয়ার পর ঘাস ছাড়া কিছু মাটি দেখা যাচ্ছে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের শত্রু আওয়ামী লীগের যথেচ্ছা অনাচারের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের জন্য এটি একটি বিজয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও প্রবাসী বাংলাদেশীরা সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করলে এবং শেখ মুজিবের প্রকৃত, ঐতিহাসিক পরিচয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে যুক্তি ও প্রমাণসহ তুলে ধরতে পারলে বাংলাদেশের স্বৈরশাসনের কলঙ্কজনক এই প্রতীককে সরিয়ে ফেলা সম্ভব।
আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, রিয়া গোপের মতো হাজার হাজার মানুষ এবং পাশাপাশি হাজারো আহত ও পঙ্গু মানুষেরা চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ মৌলিক মানবাধিকারকে ফিরিয়ে এনেছে।
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসীরা মনে করেন হাজার হাজার কোটি টাকার শক্তিতে স্থাপন করা ফ্যাসিবাদের শক্তিশালী প্রতীক এবং দীর্ঘ অনেক বছর যাবত ফ্যাসিবাদীদের উৎসব ও ক্ষমতার চিহ্ন হিসেবে টিকে থাকা এই মূর্তিটি উপড়ে ফেলার প্রকৃত কৃতিত্ব জুলাই বিপ্লবের শহিদ এবং বীরদের প্রাপ্য। তারা প্রত্যাশা করেন, বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ আর স্বৈরশাসন ও দমননীতির পরিচয় বহন করবে না; বরং মুক্তিকামী জনগণের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার ভিত্তিক কার্যক্রমই হয়ে উঠবে বাংলাদেশীদের পরিচয়ের প্রতীক।
ডিবিসি/