১৯১০-১১ সালের দিকে যুদ্ধবিমানের ব্যবহার সীমিত পরিসরে শুরু হলেও তখন মূলত এগুলো গোয়েন্দা নজরদারি বা রেকনাইস্যান্স কাজেই বেশি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু আকাশ যুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৫৮ সাল একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এ বছরই চীন-তাইওয়ান দ্বন্দ্বে প্রথমবারের মতো যুদ্ধবিমান থেকে ‘এয়ার-টু-এয়ার’ বা আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইলের সফল ব্যবহার করা হয়, যা চিরতরে বদলে দেয় যুদ্ধের কৌশল। এই যুদ্ধে চীন কল্পনাও করতে পারেনি যে, তারা প্রযুক্তির লড়াইয়ে তাইওয়ানের কাছে কীভাবে পরাজিত হতে যাচ্ছে।
ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘দ্বিতীয় তাইওয়ান প্রণালী সংকট’ চলাকালীন। সে সময় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্সের আনুমানিক ১০০ থেকে ১২৫টি মিগ-১৫ ও মিগ-১৭ যুদ্ধবিমান একযোগে তাইওয়ানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে।
সংখ্যার দিক দিয়ে চীন সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তাইওয়ানের বিমান বাহিনীও পরিকল্পনা মাফিক খুব দ্রুত চীনের যুদ্ধবিমানকে ইন্টারসেপ্ট বা প্রতিরোধ করতে শুরু করে। চীনের পাইলটদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক ছিল তাইওয়ানের কাছে থাকা আমেরিকার তৈরি গোপন মারণাস্ত্র, যা ছিল তাদের ধারণার সম্পূর্ণ বাইরে।
তাইওয়ানের বিমান বাহিনী আমেরিকার তৈরি অত্যাধুনিক শর্ট রেঞ্জের ‘এআইএম-৯ সাইডউইন্ডার’ মিসাইল সজ্জিত প্রায় অর্ধ শতাধিক এফ-৮৬ স্যাবার জেট ফাইটার যুদ্ধক্ষেত্রে নামায়। ১৯৫৬ সালে সার্ভিসে আসা ২.৫ ম্যাক গতির এই হিট-সিকিং বা তাপ সংবেদী মিসাইলটি সম্পর্কে সেই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা চীন কারোরই স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না।
ফলে আকাশ যুদ্ধে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নজিরবিহীনভাবে চীনের ৯টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। এর মধ্যে ৬টি যুদ্ধবিমানই ধ্বংস হয় সাইডউইন্ডার মিসাইলের আঘাতে। চীনের বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবিমান অংশগ্রহণ করলেও আমেরিকার এই নতুন প্রযুক্তির কাছে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করতে থাকে। অন্যদিকে এই তীব্র সংঘাতে তাইওয়ান বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমানও ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
আকাশ যুদ্ধে এটিই ছিল এয়ার-টু-এয়ার মিসাইলের প্রথম বাস্তব ব্যবহার, যা বর্তমানে সার্ভিসে থাকা বিশ্বের তাবৎ আধুনিক মিসাইলের পূর্বসূরি হিসেবে গণ্য হয়। যদিও পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের মিগ-১৯ এবং মিগ-২১ যুদ্ধবিমানগুলোকে নিজস্ব প্রযুক্তির কে-৫ মিসাইল দ্বারা সজ্জিত করে সারা বিশ্বে ব্যাপক দাপট দেখাতে থাকে।
বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মিগ-২১ যুদ্ধবিমান আমেরিকার বিমান বাহিনীর জন্য এক সাক্ষাৎ যমদূত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভিয়েতনাম যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমেরিকার সামরিক বাহিনীর আনুমানিক ৮,৫৪০ বা তার অধিক সংখ্যক এয়ারক্রাফট ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা যুদ্ধের ময়দানে মিসাইল প্রযুক্তির ভয়াবহতারই প্রমাণ দেয়।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া
সিরাজুর রহমান
শিক্ষক ও লেখক
ডিবিসি/এনএসএফ