একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অনেক সামরিক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন যে উচ্চপ্রযুক্তির ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি এবং সাইবার সক্ষমতার ক্রমবর্ধমান বিকাশের ফলে অদূর ভবিষ্যতে মেইন ব্যাটল ট্যাংকের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন কিছু চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিশ্বের উন্নত ও প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ দেশগুলো মেইন ব্যাটল ট্যাংককে আরও উন্নত প্রযুক্তি ও সেন্সর ইনস্টল করার পাশাপাশি অধিক কার্যকর এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে উপযোগী করে তুলেছে।
বর্তমান নতুন প্রজন্মের মেইন ব্যাটল ট্যাংক শুধু শক্তিশালী কামানের মাধ্যমে গোলাবর্ষণই করে না বরং উন্নত সেন্সর, ডিজিটাল ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম, সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, যুদ্ধক্ষেত্রের রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির সহায়তায় আরও কার্যকরভাবে অভিযান পরিচালনা করতে সহায়তা করে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রথম সারির প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত এবং তুরস্কসহ বেশ কিছু দেশ নতুন প্রজন্মের মেইন ব্যাটল ট্যাংক প্রযুক্তির উন্নয়ন, আধুনিকীকরণ এবং পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে।
গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার-এর ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মেইন ব্যাটল ট্যাংক পরিচালনা করে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি। দেশটির সেনাবাহিনীর ভাণ্ডারে প্রায় ৫,৮৭০টি সক্রিয় মেইন ব্যাটল ট্যাংক রয়েছে।
একই সূত্র অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর কাছে রয়েছে প্রায় ৫,৬৩০টি, উত্তর কোরিয়ার ৪,৮৯৫টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কাছে প্রায় ৪,৬৬৬টি অপারেশনাল মেইন ব্যাটল ট্যাংক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান এমবিটি হচ্ছে আব্রামস এম১ এবং রাশিয়ার টি-৯০ মেইন ব্যাটল ট্যাংক।
এছাড়া, বিশ্বের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দেশের মধ্যে ভারতের কাছে রয়েছে প্রায় ৩,৯১৩টি, মিশরের ৩,৬২০টি, পাকিস্তানের ২,৬৭৭টি, ইরানের ২,৬৭৫টি, তুরস্কের ২,২৮৪টি, ভিয়েতনামের ১,৯৯৯টি, দক্ষিণ কোরিয়ার ১,৮৩১টি, জর্ডানের ১,৫০৮টি, আলজেরিয়ার ১,৪৮৫টি, আজারবাইজানের ১,৩৫৪টি এবং মরক্কোর প্রায় ১,৩৪৬টি বিভিন্ন মডেলের মেইন ব্যাটল ট্যাংক রয়েছে।
যদিও আধুনিক স্থলযুদ্ধে মেইন ব্যাটল ট্যাংক এখনো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রব্যবস্থা, তবুও সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো দেখিয়েছে যে ড্রোন, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল, লইটারিং মিউনিশন এবং নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম আধুনিক অস্ত্রের কারণে ট্যাংকের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে।
ফলে ট্যাংকের পাশাপাশি সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং মানববিহীন প্রযুক্তির গুরুত্বও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে প্রকাশযোগ্য যে, ১৯৯০-৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকের সামরিক বাহিনীর প্রায় ১,২০০টিরও বেশি মেইন ব্যাটল ট্যাংক ধ্বংস হয়েছিল।
অন্যদিকে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিভিন্ন উন্মুক্ত তথ্যসূত্র, গবেষণা প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ পর্যন্ত উভয় পক্ষের সম্মিলিতভাবে আনুমানিক ২,৫০০-৩,০০০ বা তারও বেশি মেইন ব্যাটল ট্যাংক ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের ধরন পরিবর্তিত হলেও মেইন ব্যাটল ট্যাংক এখনো স্থলযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে টিকে রয়েছে। তবে, ভবিষ্যতে উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানববিহীন প্রযুক্তির সমন্বয় এবং নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিচালনার মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্মের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লেখক পরিচিতি:
সিরাজুর রহমান, শিক্ষক ও লেখক, বাংলাদেশ।
ডিবিসি/আরএসএল