অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ভূমি দখলকারী ইসরায়েলিদের হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন ৭৯ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি বৃদ্ধ ইব্রাহিম ইসমাইল আল-জুবুর। তবে বারবার এমন নির্মম হামলার শিকার হলেও বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি এবং জীবিকার একমাত্র উৎস ত্যাগ করতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি ভূমি দখলকারী ইসরায়েলিদের এক হামলায় জুবুরের পরিবারের দুই শিশুসহ ছয় সদস্য আহত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক ইসরায়েলি জুবুরের মুখে পেপার স্প্রে করছে এবং পরিবারের সদস্যদের আর্তচিৎকারের মধ্যেই বৃদ্ধ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন। জুবুর জানান, এটিই প্রথম নয়; এর আগেও তার মুখে পেপার স্প্রে করা হয়েছিল।
গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জুবুর তার পৈতৃক জমির প্রতি গভীর অনুরাগের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমি এখানেই জন্মেছি, ঠিক যেখানে এখন এই অবৈধ বসতিটি অবস্থিত; আমি এখানেই পৃথিবীকে চিনেছি এবং এখানেই বড় হয়েছি।’
জুবুরের জমি সংলগ্ন আলোচিত অবৈধ ইহুদি বসতিটি ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে হাওয়ারা গ্রামে ফিলিস্তিনি ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখান থেকেই স্থানীয় জনগণের ওপর নিয়মিত হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জুবুর জানান, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই দখলদারদের সর্বাত্মক সুরক্ষা দেয়। তিনি বলেন, ‘দখলদাররা ক্রমাগত আমাদের ভূমিতে কুকুর ও ভেড়া নিয়ে আসে এবং শিশু ও নারীদের ওপর হামলা করে। আমরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে সেনাবাহিনী এসে তাদের সুরক্ষা দেয়, উল্টো আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী না থাকলে তারা আমাদের ভূমিতে প্রবেশ করতে পারত না।’
নিজেদের মালিকানার পক্ষে সরকারি কাগজপত্র থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে এই জমি ছেড়ে যেতে বলে, কিন্তু আমি যাব না। এই আক্রমণ সত্ত্বেও আমি আমার জমিতেই থাকব এবং নিজের কবর খুঁড়ে এখানেই সমাহিত হব।’
নিজেদের জমিতে অনেক কষ্ট করে সেচ দিয়ে জলপাই, বাদাম, এপ্রিকট ও প্লাম গাছ লাগিয়েছেন জুবুর। কিন্তু দখলদারদের রাতের বেলা অতর্কিত অভিযানের ভয়ে বর্তমানে তার পরিবারের সদস্যরা পালা করে রাত জেগে পাহারা দেন।
শুধু হাওয়ারা গ্রাম নয়, মেসাফির ইয়াত্তা অঞ্চলের গ্রামগুলোতেও ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলিদের এমন আগ্রাসন ক্রমশ বাড়ছে। নিজ জমি ছাড়তে বাধ্য করার জন্যই মূলত স্থানীয় জনগণের ওপর এই হামলাগুলো চালানো হয়।
ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি দখলদারদের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে । পিএলও-এর প্রতিবেদন বলছে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই ফিলিস্তিনি ভূমি জবরদখলকারী ইসরায়েলিরা মোট ৩,৪৮৮টি হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জনবসতিতে হামলা, বাড়ি ও যানবাহনে আগুন, ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে গুলি, জমি বাজেয়াপ্ত এবং অবৈধ বসতি স্থাপন।
হতাহতের ভয়াবহ চিত্র অনুযায়ী ফিলিস্তিনি সরকারি যোগাযোগ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৮ই অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২৯শে জুনের মধ্যে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলায় ১,১৭৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ১৩,০০০ জন আহত এবং ২৪,০০০ জনকে আটক করা হয়েছে।
শত নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মাঝেও জুবুরের মতো ফিলিস্তিনিরা তাদের মাতৃভূমির প্রতি যে অটল ভালোবাসা ও সাহস দেখিয়ে চলেছেন, তা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার এক অবিচল সংগ্রামেরই প্রতিচ্ছবি।
সূত্র: আনাদোলু
ডিবিসি/এমএনকে