বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা, কঠোর নিরাপত্তা ও নিপুণ স্বাস্থ্য সুরক্ষার মধ্য দিয়ে আজ মঙ্গলবার (৯ জিলহজ) পবিত্র আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন লাখো হাজি। মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও আত্মশুদ্ধির আকুল প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হলো হজের সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ এই মূল আনুষ্ঠানিকতা।
পবিত্র এই দিনে মক্কা অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ নামিরাহ-তে হজের বার্ষিক খুতবা অনুষ্ঠিত হয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ১৪শ বছরেরও বেশি সময় আগের সুন্নাত অনুসরণ করে হাজিগণ সেখানে জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে কসর (সংক্ষিপ্ত) করে আদায় করেন। এবারের হজের খুতবা প্রদান করেন মসজিদে নববীর সম্মানিত ইমাম শেখ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফী।
মিনার তাঁবু শহরে ফজর নামাজ আদায়ের পর হাজিগণ আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা হন। রয়্যাল কমিশন ফর মক্কা সিটি অ্যান্ড হোলি সাইটসের অধীনে পরিচালিত জেনারেল ট্রান্সপোর্ট সেন্টার জানিয়েছে, অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার কারণে গত বছরের তুলনায় এবার দুই ঘণ্টা আগেই-সকাল ৮টার মধ্যে হাজিদের আরাফাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
মক্কা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই সুবিশাল আরাফাত ময়দান ও এর কেন্দ্রস্থলে থাকা জাবাল আল-রাহমাহ (রহমতের পাহাড়) মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, এখানেই আদি পিতা আদম ও মাতা হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলন হয়েছিল।
আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের প্রধান স্তম্ভ। এই ময়দানে উপস্থিত না হলে হজ সম্পূর্ণ বা বৈধ হয় না।
ইমাম শেখ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফী তাঁর খুতবায় হজের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, হজ হলো বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ-যা ভাষা, বর্ণ ও জাতীয়তার ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে এক কাতারে শামিল করে। তিনি উপস্থিত হাজিদের আল্লাহর প্রতি সদা সচেতন ও পরহেজগার হওয়ার এবং আখেরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি হজের পবিত্রতা বজায় রাখতে যেকোনো ধরনের বিতর্ক, বিশৃঙ্খলা ও অনভিপ্রেত আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজিদের যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৪,০০০ বাস, আধুনিক ক্রাউড-কন্ট্রোল (জনতা নিয়ন্ত্রণ) ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছে। 'ফ্যাসিলিটিজ সিকিউরিটি ফোর্সেস' পবিত্র স্থানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সার্বিক সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কারণে এখন পর্যন্ত কোনো মহামারি বা ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়নি।
মক্কার হজ ও ওমরাহ স্থায়ী কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং ডেপুটি গভর্নর প্রিন্স সৌদ বিন মিশাল বিন আবদুল আজিজ আরাফাত থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, আল্লাহর মেহমানদের সেবা করা আমাদের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কিংডম তার সমস্ত প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং জাতীয় দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছে যাতে হাজিরা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও শান্তিময় পরিবেশে হজ পালন করতে পারেন।
তিনি হাজিদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ধন্যবাদ জানান। হজে অংশ নিতে পেরে হাজিরা তাঁদের পরম সৌভাগ্যের কথা প্রকাশ করেছেন।
নাইজেরিয়ার আলিয়ু বিউ বলেন, আমার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সৌদি সরকার আমাদের জন্য চমৎকার ব্যবস্থা করেছে, আমরা সত্যিই আনন্দিত।
বাংলাদেশের কাজী হাবিবুর রহমান আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, আমি কখনো ভাবিনি আরাফাতের ময়দানে আসতে পারব। আমরা খুব বিশেষ একটি মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছি। আমি সব মুসলমান এবং শহীদ সাহাবিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেছি।
জর্ডানের কাসিম আসাদি এই অনুভূতিকে অবর্ণনীয় বলে উল্লেখ করেন এবং সৌদি আরবের এই চমৎকার সেবামূলক ব্যবস্থার জন্য দেশটির কল্যাণ কামনা করেন।
আরাফাতের ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকার পর হাজিগণ মুজদালিফার দিকে রওনা হবেন। সেখানে রাত যাপন এবং পাথর সংগ্রহের পর তাঁরা পুনরায় মিনায় ফিরবেন হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে। ইতোমধ্যে সৌদি পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মুজদালিফা এবং মিনার রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজ জোরদার করেছে।
সূত্র: আরব নিউজ
ডিবিসি/এসএফএল