গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন থার্মাল এবং থার্মোবারিখ অস্ত্রের কারণে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির লাশের কোনো চিহ্নই পাওয়া যাচ্ছে না। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার একটি সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, ৩,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জ্বলা এসব অস্ত্রের আঘাতে প্রায় ৩,০০০ ফিলিস্তিনি আক্ষরিক অর্থেই বাষ্পীভূত হয়ে গেছেন।
গাজার সিভিল ডিফেন্স বা বেসামরিক প্রতিরক্ষা দলের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ২,৮৪২ জন ফিলিস্তিনির নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে যারা এমনভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। হামলার পর তাদের শরীরের কোনো অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি, শুধুমাত্র রক্তের ছিটা বা মাংসের ছোট টুকরো ছাড়া।
সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, তারা হামলার স্থানগুলোতে উদ্ধারকাজ চালানোর সময় বাড়িতে থাকা মানুষের সংখ্যার সাথে উদ্ধারকৃত লাশের সংখ্যা মিলিয়ে দেখেন। যদি কোনো দেহাবশেষ না পাওয়া যায় এবং কেবল জৈবিক চিহ্ন থাকে, তবে তাদের ‘বাষ্পীভূত’ বা নিশ্চিহ্ন হিসেবে গণ্য করা হয়।
সামরিক ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ থার্মাল এবং থার্মোবারিখ অস্ত্র ব্যবহার করছে, যা ‘ভ্যাকুয়াম’ বা ‘এরোসল’ বোমা নামেও পরিচিত। রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ ভ্যাসিলি ফাতিগারোভ জানান, এই অস্ত্রগুলো সাধারণ বিস্ফোরকের মতো নয়। এগুলো বিস্ফোরণের সময় বিশাল অগ্নিপিণ্ড এবং ভ্যাকুয়াম ইফেক্ট তৈরি করে।
অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং টাইটানিয়ামের মিশ্রণ তাপমাত্রাকে ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নিয়ে যায়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ডা. মুনির আল-বুরশ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করেন যে, মানবদেহের ৮০ শতাংশই পানি। যখন শরীর ৩,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ ও প্রচণ্ড চাপের সংস্পর্শে আসে, তখন শরীরের তরল মুহূর্তেই ফুটে বাষ্প হয়ে যায় এবং টিস্যু ভস্মীভূত হয়ে যায়।
তদন্তে বেশ কিছু নির্দিষ্ট মার্কিন অস্ত্রের নাম উঠে এসেছে যা এই ঘটনার সাথে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে ৯০০ কেজি ওজনের MK-84 ‘হ্যামার’ বোমা, যা ৩,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ উৎপন্ন করতে পারে।
এছাড়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল-মাওয়াসি ‘সেফ জোনে’ হামলায় BLU-109 বাঙ্কার বাস্টার বোমা ব্যবহৃত হয়, যেখানে ২২ জন মানুষ বাষ্পীভূত হন। আল-তাবিন স্কুলে হামলায় ব্যবহৃত হয় GBU-39 প্রিসিশন গ্লাইড বোমা, যা অবকাঠামো ঠিক রেখে ভেতরের সবকিছু ধ্বংস করে দেয় এবং প্রেসার ও থার্মাল ওয়েভের মাধ্যমে মানুষকে হত্যা করে।
আইনজীবীরা বলছেন, বাছবিচারহীন এসব অস্ত্রের ব্যবহার যুদ্ধাপরাধের শামিল এবং এর দায় শুধু ইসরায়েলের নয়, এর যোগানদাতা পশ্চিমা দেশগুলোরও। আইনজীবী ডায়ানা বাট্টু একে ‘বৈশ্বিক গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভুক্তভোগী ইয়াসমিন মাহানি আল-তাবিন স্কুলে হামলার পর তার ছেলে সাদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাননি। তিনি জানান, সেখানে তিনি শুধু রক্ত আর মাংসের ওপর পা ফেলছিলেন, ছেলের কবর দেওয়ার মতো কোনো শরীরও পাননি।
একইভাবে রফিক বদরান বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে তার চার সন্তানকে হারিয়েছেন, যাদের লাশের কোনো অংশই আর অবশিষ্ট নেই।
সূত্র: আল জাজিরা
ডিবিসি/এনএসএফ