মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে ইন্দোনেশিয়া। পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপের কাছে ৭.৭ মাত্রার প্রথম শক্তিশালী ভূমিকম্পটিতে অন্তত ৪০ জন নিহত এবং ৫০ জন আহত হয়েছেন। দিনের পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার পশ্চিমে সুমাত্রা দ্বীপে ৬.৯ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। তবে সুমাত্রায় আঘাত হানা দ্বিতীয় ভূমিকম্পটিতে প্রাথমিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ফ্লোরেস দ্বীপে আঘাত হানা প্রথম ভূমিকম্পটির পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিতদের সন্ধানে উদ্ধারকারী দল জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। উদ্ধারকারী কর্মকর্তা ফতুর রহমান জানান, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ফ্লোরেস দ্বীপের ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪০-এ দাঁড়িয়েছে। পার্শ্ববর্তী মাঙ্গারাই জেলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো দুজন আটকে থাকার খবর পাওয়া গেছে। মাউমেরে বন্দরে আংশিকভাবে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এরই মধ্যে দুজনকে জীবিত ও একজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। ভূমিধসের কারণে বেশ কয়েকটি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার অভিযান কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ পরিমাণ এখনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা সুহারিয়ান্তো জানিয়েছেন, প্রায় দুই হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেয়েন জোটের 'কোপারনিকাস' ভূ-পর্যবেক্ষণ উপগ্রহের মাধ্যমে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন।
ভূমিকম্পের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অগভীর এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল উপকূলীয় শহর এন্ডে থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। কেন্দ্রস্থলের সবচেয়ে কাছের এলাকা নাগেকেওর বাসিন্দারা ভোরে সমুদ্রের জল সরে যেতে দেখে আতঙ্কে উঁচু ভূমির দিকে ছুটে যান, যা সাধারণত সুনামির পূর্বলক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিদ্যা সংস্থা (বিএমকেজি) প্রাথমিকভাবে সুনামির সতর্কতা জারি করলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়। তবে সংস্থাটির কর্মকর্তা উইজায়ান্তো জানিয়েছেন, সতর্কতা তুলে নিলেও তারা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার ওপর নজর রাখছেন। আফটারশকের আশঙ্কায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো ধসে পড়তে পারে বলে স্থানীয়দের সেখানে ফিরে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি আফটারশক বা অনুকম্প অনুভূত হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীটির মাত্রা ছিল ৬.১।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। রুটেং শহরের বাসিন্দা ইউলিয়ান জুইতা একালিয়া জানান, ভূমিকম্পের সময় মনে হচ্ছিল তারা ট্রাম্পোলিনের ওপর আছেন। মুহূর্তের মধ্যেই তার বাড়ির টেলিভিশন, আলমারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ধসে পড়ে। মাউমেরের একটি হাসপাতালের কর্মকর্তা লুকাস লোতার জানান, কম্পনের তীব্রতায় আতঙ্কিত রোগীরা হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান এবং বেশ কয়েকটি দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। নাগেকেওর বাসিন্দা ইয়োহানেস বাবো জানান, তীব্র কম্পনের সময় তারা দ্রুত নিরাপদ স্থানে ও পাহাড়ের দিকে সরে যান।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অফ ফায়ার'-এ অবস্থিত হওয়ায় ইন্দোনেশিয়া এবং এর প্রতিবেশী দেশগুলো অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ। দেশটিতে এর আগেও ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এর আগে ১৯৯২ সালে এই ফ্লোরেস দ্বীপেই ৭.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ও সুনামিতে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া ২০০৪ সালে সুমাত্রার উপকূলে ৯.১ মাত্রার প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প এবং এর ফলে সৃষ্ট সুনামিতে সমগ্র অঞ্চলে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, যা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে পরিচিত। পরবর্তীতে ২০১৮ সালেও লম্বক ও সুলাওয়েসি দ্বীপে ভূমিকম্প ও সুনামির ঘটনায় কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
সূত্র: দ্য জার্নাল
ডিবিসি/পিআরএএন