ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তেহরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার (১ এপ্রিল) জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে তিনি হুমকি দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের দেওয়া শর্ত মেনে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে না এলে ইরানকে বোমা মেরে পাথর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
সামরিক ও রাজনৈতিক পরিভাষায় পাথর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া বলতে মূলত কার্পেট বোম্বিং বা নির্বিচারে ব্যাপক বোমাবর্ষণকে বোঝানো হয়। এর মূল লক্ষ্য থাকে একটি দেশের আধুনিক সভ্যতার সমস্ত ভিত্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া। হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আকাশচুম্বী ভবন এমনকি পাবলিক পার্ক-কিছুই এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাদ পড়ে না।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের হামলা সরাসরি গণহত্যার শামিল। বর্তমানে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী যে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে, মার্কিন হুমকির ধরণ অনেকটা সেরকমই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানকে দেওয়া এই হুমকি আমেরিকার জন্য নতুন কিছু নয়। পাথর যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার এই অমানবিক কৌশলের শিকড় বেশ গভীরে- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও কার্টিস লে-মে: এই শব্দবন্ধটির উদ্ভাবক হিসেবে ধরা হয় মার্কিন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা কার্টিস লে-মেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি শহরগুলোতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের তদারকি করেছিলেন তিনি।
উত্তর কোরিয়া (১৯৫০): পঞ্চাশের দশকের শুরুতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী উত্তর কোরিয়ায় ব্যাপক কার্পেট বোম্বিং চালায়। এতে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৯৫ শতাংশ এবং ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ: কার্টিস লে-মে পরবর্তীতে তার আত্মজীবনীতে ভিয়েতনামকেও বোমা মেরে পাথর যুগে পাঠানোর পক্ষে সওয়াল করেন। ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন উত্তর ভিয়েতনামে ভয়াবহ বোমাবর্ষণের নির্দেশ দেন, যা মার্কিন জনগণের কাছে ক্রিসমাস বোম্বিং নামে পরিচিত ছিল।
পাকিস্তান (৯/১১ পরবর্তী): ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ দাবি করেছিলেন, তালেবান বিরোধী যুদ্ধে যোগ না দিলে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে পাথর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।
চারু কস্তুরীর এই বিশেষ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যখনই কোনো দেশকে সামরিকভাবে সম্পূর্ণ পরাস্ত করতে চায়, তখনই তারা এই পাথর যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার তকমা ব্যবহার করে একটি মানবিক বিপর্যয়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। ইরানের ক্ষেত্রেও কি সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে? বিশ্ব রাজনীতি এখন সেই শঙ্কায় আচ্ছন্ন।
সূত্র: আল জাজিরা
ডিবিসি/এসএফএল