ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ধারণা ছিল, ইরানের বিরুদ্ধে বিজয় মধ্যপ্রাচ্যের খোলনলচে পাল্টে দেবে। অঞ্চলটি হয়তো সত্যিই বদলাচ্ছে, তবে তাদের প্রত্যাশানুযায়ী নয়। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান পরাজিত হয়নি, উল্টো এখন সেখানে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা বারবার প্রকাশ্য যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের পরাস্ত করা কতটা কঠিন। এর সবশেষ প্রমাণ মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনা।
এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরানের শাসকরা এখনো পশ্চিমাদের আঘাত করতে সক্ষম এবং বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে এই যুদ্ধে তারা শীর্ষস্থানে থাকতে বদ্ধপরিকর।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর সামরিক কর্মকর্তারা হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে এমনভাবে পা ফেলার চেষ্টা করবেন, যাতে নিজেদের শক্তিও প্রদর্শন করা যায়, আবার শ্লথ গতির কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও ব্যাহত না হয়। হেলিকপ্টারের ক্রুরা বেঁচে গেছেন, তবে তারা নিহত হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হয়তো আরও ভয়াবহ হতো। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ বেশ অজনপ্রিয়, আর তাই ট্রাম্প চাচ্ছেন যেকোনো মূল্যে একটি চুক্তি করে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে এবং ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে। কিন্তু কাজটি তার জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতিহাসের পুরোনো সেই শিক্ষাই যেন নতুন করে পাচ্ছেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু, যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, পরিষ্কার বিজয় নিয়ে তা শেষ করা ঠিক ততটাই কঠিন। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে যখন তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, তখন উভয়ের কথায় এমন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের আভাস ছিল যেন ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ইরানি শাসকগোষ্ঠীর পতন কেবল সময়ের ব্যাপার। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো থেকে ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশ্যে দ্রুত সরকার পতনের ডাক দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, তেল আবিব থেকে নেতানিয়াহুও তার ৪০ বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও সহজেই সরকার পরিবর্তন করা যাবে। অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও দুর্নীতির কারণে ধুঁকতে থাকা একটি দেশ, যার মিত্ররা (হামাস, হিজবুল্লাহ এবং সিরিয়ার বাশার আল আসাদ) ইতোমধ্যেই পর্যুদস্ত, তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক শক্তির সামনে টিকতে পারবে না, এমনটাই ছিল তাদের হিসাব।
কিন্তু তারা ইরানের শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার ক্ষমতা, নির্মমতা ও কৌশলগত বুদ্ধিমত্তাকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। শীর্ষ নেতাদের হত্যার মাধ্যমে সরকারের অভ্যন্তরীণ পতনের যে স্বপ্ন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেখেছিল, তা ব্যর্থ হয়েছে। বরং নতুন ইরানি নেতৃত্ব আগের চেয়েও বেশি আদর্শিক এবং যেকোনো চরম ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। তারা মনে করে, কেবল কথার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে থামানো যাবে না; বরং আঘাতের বিনিময়ে যন্ত্রণাদায়ক প্রত্যাঘাতই তাদের একমাত্র কৌশল। এর অংশ হিসেবে ইরান এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের সঙ্গে লেবাননের যুদ্ধকে যুক্ত করেছে। তাদের স্পষ্ট বার্তা, ইসরায়েল যদি লেবাননে বোমাবর্ষণ এবং হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে, তবে ট্রাম্প কোনো চুক্তির আশা করতে পারেন না।
ট্রাম্প একটি চুক্তির স্বার্থে লেবানন ও উপসাগরীয় পরিস্থিতির এই যোগসূত্র পরোক্ষভাবে মেনে নিয়ে বৈরুতে ইসরায়েলি হামলা বাতিল করতে বললেও, নেতানিয়াহু এটি মানতে নারাজ। নেতানিয়াহুর কাছে এই শর্ত ‘অগ্রহণযোগ্য’। কিন্তু ট্রাম্প এই মুহূর্তে যুদ্ধ শেষ করতে যতটা মরিয়া, নেতানিয়াহু ইরানি শাসনব্যবস্থা পঙ্গু না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ঠিক ততটাই বদ্ধপরিকর।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর। উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো, যারা মূলত স্থিতিশীলতা ও বাণিজ্যের ওপর ভর করে তাদের ভবিষ্যৎ সাজিয়েছিল, তারা এখন বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন। গত মার্চ থেকে বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি জুনের মধ্যে না খুললে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে বিপর্যয়ের সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল, তা এখন চরম বাস্তব। কোনো অভাবনীয় কূটনৈতিক অগ্রগতি ছাড়া সহসাই বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
সূত্র: বিবিসি
ডিবিসি/এফএইচআর