আন্তর্জাতিক

ইরানযুদ্ধের মাশুল দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

২ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি এবং শুল্ক আরোপের কারণে আগে থেকেই চাপের মুখে থাকা মার্কিন অর্থনীতি এই যুদ্ধের ফলে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জ্বালানি পাম্প থেকে শুরু করে মুদিবাজার, সবখানেই মার্কিন নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

এই যুদ্ধ মার্কিন জনগণের কাছে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সিবিএস নিউজের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার নীতিকে সমর্থন করছেন না ৬৬ শতাংশ মার্কিনি। এবিসি নিউজ এবং ওয়াশিংটন পোস্ট-ইপসোস-এর অপর একটি জরিপেও একই চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে সামরিক পদক্ষেপকে 'ভুল সিদ্ধান্ত' বলে অভিহিত করেছেন।

 

যুদ্ধের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের পকেটে টান পড়েছে সবচেয়ে বেশি। মুডি'স অ্যানালিটিকসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন পরিবারগুলোর গড়ে ৭৫০ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি যাচ্ছে জ্বালানি খাতে, যেখানে তাদের গড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৪৭.১৯ ডলার বেশি খরচ করতে হচ্ছে। মুডি'স অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি একে একটি 'বড় ধরনের অর্থনৈতিক আঘাত' আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এই চাপ ইতিমধ্যে সংগ্রামরত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপরই বেশি পড়ছে। টাফটস ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুলের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিষয়ক অধ্যাপক মাইকেল ক্লেইন আল জাজিরাকে জানান যে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশই আবাসন ও খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে, আর এই দুই খাতেই দাম বর্তমানে হু হু করে বাড়ছে।

 

জ্বালানি তেলের বাজারে এই যুদ্ধের প্রভাব একেবারে স্পষ্ট। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (যেদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম ইরানে হামলা চালায়) তেলের দাম ছিল গড়ে ২.৯৮ ডলার, যা লাফিয়ে ৪.২২ ডলারে (প্রতি গ্যালন বা ৩.৭৮ লিটার) দাঁড়িয়েছে। এর পেছনে বড় কারণ হলো ইরানের পাল্টা জবাব; দেশটি জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয় বলে এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের সর্বশেষ পার্সোনাল কনজাম্পশন এক্সপেন্ডিচার (পিসিই) রিপোর্ট অনুযায়ী, জ্বালানির দাম ৫.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সার্বিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ। পিসিই-এর তথ্যমতে, সার্বিক মূল্যস্ফীতি আগের মাসের ৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।

 

অর্থনৈতিক এই চাপের কারণে মার্কিনিদের প্রাত্যহিক জীবনেও পরিবর্তন এসেছে; তারা এখন বাসা থেকে কাজ করতে বা গাড়ি চালানোর প্রয়োজন হয় এমন পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রেতা প্ল্যাটফর্ম আমেরিকান মাসল-এর জরিপে ১২ শতাংশ মার্কিনি জানিয়েছেন যে জ্বালানির দাম বাড়ায় তারা বেশি মাত্রায় রিমোট ওয়ার্ক বা বাসা থেকে কাজ করছেন। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন পোস্ট/এবিসি নিউজ-ইপসোসের জরিপে ৪৪ শতাংশ মার্কিনি জানিয়েছেন যে তারা গাড়ি চালানো কমিয়ে দিয়েছেন। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি মূল্যের কারণে মে মাসের জরিপে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের কনজ্যুমার সেন্টিমেন্ট ট্র্যাকার ৪৪.৮-এ নেমে এসেছে, যা গত এপ্রিলে ছিল ৪৯.৮ এবং গত বছরের মে মাসে ছিল ৫২.২। ম্যাককিনসে এবং কনফারেন্স বোর্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোক্তাদের মনোভাব গত দুই বছরের মধ্যে তলানিতে ঠেকেছে এবং দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন ভোক্তা খরচের ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদের ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন।

 

জ্বালানির এই ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে এভিয়েশন খাতেও। গত মাসে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে স্পিরিট এয়ারলাইনস তিন দশকের বেশি সময় পর তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি, ইউনাইটেড এয়ারলাইনস তাদের ভাড়া ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন শ্রম দপ্তরের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিলে বিমান ভাড়া যথাক্রমে ২.৭ এবং ২.৮ শতাংশ বেড়েছে।

 

জ্বালানির পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এপ্রিলে খাদ্যের দাম ০.৫ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। গত মাসে মাংসের দাম ১.৩ শতাংশ এবং ফল ও সবজির দাম ১.৮ শতাংশ বেড়েছে। সিপিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, শুল্ক ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাবে শুধু মার্চ মাসেই টমেটোর দাম আগের মাসের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। কৃষিখাতেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। সার তৈরির মূল উপাদান নাইট্রোজেন ও সালফারের অন্যতম বড় সরবরাহকারী হলো উপসাগরীয় অঞ্চল, যা বিশ্বের ৩৬ শতাংশ ইউরিয়া রপ্তানি করে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছর শেষে সারের দাম ৩১ শতাংশ এবং ইউরিয়ার দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ক্লিভল্যান্ডের কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক জনাথন আর্নস্ট জানিয়েছেন, মার্কিন কৃষকদের এখন ট্রাক্টর চালানো ও পরিবহনের জন্য ডিজেলের বাড়তি দাম দেওয়ার পাশাপাশি ফসল ফলাতেও বেশি খরচ করতে হচ্ছে, যার চুড়ান্ত প্রভাব আগামী শরতে বাজারে গিয়ে পড়বে।

 

যুদ্ধের অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আবাসন ঋণের ক্ষেত্রেও। ৩০ বছর মেয়াদি ফিক্সড মর্টগেজের গড় হার ফেব্রুয়ারির ৫.৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে গত মাসের শেষের দিকে ৬.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণে ইউএস ট্রেজারি ইয়েল্ড বাড়ায় ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দিয়েছে। অধ্যাপক ক্লেইন জানান, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির কারণে ডলারের ভবিষ্যৎ মান কমার আশঙ্কায় ঋণদাতারা সুদের হার বাড়িয়ে দেন। এদিকে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় ফেডারেল রিজার্ভের নিকট ভবিষ্যতে সুদহার কমানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। জেপি মরগ্যান চেজের একজন বিশ্লেষক ধারণা করছেন, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফেড সুদহার পরিবর্তন করবে না এবং এরপর তা কমানোর বদলে বাড়ানো হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সুদহার কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসলেও, গত মাসে ফেডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিশ্চিত হওয়া কেভিন ওয়ার্শ আগামী ১৬-১৭ জুনের পলিসি মিটিংয়ে তার প্রথম বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হবেন।

 

একদিকে ভোক্তারা যখন চরম আর্থিক চাপের মুখে, অন্যদিকে পেন্টাগন যুদ্ধের জন্য বিপুল অর্থ দাবি করে চলেছে। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানে সামরিক অভিযানের পেছনে পেন্টাগন প্রতিদিন ২০০ কোটি ডলার ব্যয় করছে। গত মার্চে পেন্টাগন সামরিক অভিযানের জন্য বাজেটের বাইরে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল চেয়েছিল, যার প্রেক্ষিতে হোয়াইট হাউস ৯৮ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা ব্যয়ের অনুরোধ করে। হোয়াইট হাউসের সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী ২০২৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি। আর এই বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবেশ, শিক্ষা, কৃষি এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব পরিষেবার (আইআরএস) মতো অ-প্রতিরক্ষা খাতগুলো থেকে ১০ শতাংশ বা ৭৩ বিলিয়ন ডলার বাজেট কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
 

সূত্র: আলজাজিরা

 

ডিবিসি/এফএইচআর

আরও পড়ুন