আন্তর্জাতিক

ইরানযুদ্ধের রহস্যময় চরিত্র ‘মাহমুদ আহমাদিনেজাদ’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

৫ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের সম্ভাব্য নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিবেচনা করেছিল বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কট্টর ইসরায়েলবিরোধী এবং বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত একজন নেতাকে নিয়ে এমন পরিকল্পনা মার্কিন ও ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মধ্যেই তীব্র সংশয় সৃষ্টি করেছে। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের দাবি, ‘যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনায়’ এমন একটি পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছিল যেখানে আহমাদিনেজাদ ইরানের বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে সরে গিয়ে ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে উঠে আসতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে গৃহবন্দিত্ব থেকে তাঁকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে চালানো এক হামলায় তিনি আহত হওয়ায় এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। বর্তমানে আহমাদিনেজাদ বা তাঁর সহযোগীরা এই বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি এবং তাঁর অবস্থানও অজানা।

প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আহমাদিনেজাদ ইসরায়েলের পতন অবশ্যম্ভাবী দাবি করে একে ‘মনগড়া শাসনব্যবস্থা’ অভিহিত করেছিলেন, হলোকাস্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর এই কঠোর অবস্থানকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রায়শই ইরানের হুমকির প্রমাণ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতেন। ২০০৮ সালে মোসাদের সাবেক প্রধান এফ্রাইম হালেভি তাঁকে "ইসরায়েলের জন্য ইরানের সবচেয়ে বড় উপহার" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, কারণ তাঁর বক্তব্য বিশ্বকে ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে আরও গুরুত্ব সহকারে নিতে বাধ্য করেছিল। তবে আহমাদিনেজাদের সমর্থকেরা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি কেবল একটি আদর্শিক নীতি অনুসরণ করেছিলেন যা পশ্চিমের মুখোমুখি অবস্থান নেয়।

 

২০১৩ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর আহমাদিনেজাদের ভাবমূর্তিতে বড় পরিবর্তন আসে। তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান, যার ফলে পরবর্তীতে ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁকে আর নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি সামাজিক মাধ্যমে মার্কিন র‌্যাপার টুপাক শাকুরের উদ্ধৃতি দিয়ে কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করে পশ্চিমা শ্রোতাদের কাছে একটি সংযত ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করলেও ৯ কোটির দেশে ক্ষমতা দখলের মতো সমর্থন তাঁর ছিল না। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ রাজ জিম্মিত তাঁকে জনতাবাদ ও সুযোগ সন্ধানের এক মিশ্রণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

বিবিসি পার্সিয়ানের সাথে আলাপকালে তিন মার্কিন বিশেষজ্ঞ এই পরিকল্পনা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যাক্স আব্রাহমস মনে করেন, যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট ভুল তথ্যের কারণে এই বিবরণকে অত্যন্ত সন্দেহের চোখে দেখা উচিত; কারণ হলোকাস্ট অস্বীকারকারী হিসেবে ইসরায়েল বা ট্রাম্প প্রশাসন তাঁর প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানানোর কথা নয়। আমেরিকান ফরেন পলিসি কাউন্সিলের ইলান বারম্যান এবং আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের মাইকেল রুবিনও এই পরিকল্পনাকে অসম্ভব ও কল্পনাপ্রসূত বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিজ ও ইয়োসি মেলম্যান এক্সে লিখেছেন, আহমাদিনেজাদের কোনো নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক বা সামরিক ভিত্তি নেই এবং আইআরজিসি কখনোই তাঁকে মেনে নিত না। বিমান হামলা ও সংখ্যালঘু বিদ্রোহের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা ধসিয়ে আহমাদিনেজাদকে মুকুট পরানোর এই চিন্তা পরিকল্পনাকারীদের এক অবাস্তব কল্পনার জগতকেই প্রকাশ করে।

 

এত সংশয় সত্ত্বেও কেন আহমাদিনেজাদের নাম এলো, তার উত্তরে বিশ্লেষকরা তাঁর পরিচিতি, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং সর্বোচ্চ নেতার সাথে তাঁর দূরত্বকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি সমাজের নিম্নবর্গের ভাষা বোঝেন এবং খামেনির বিরোধী হওয়ায় তাঁকে সম্পূর্ণ শাসনব্যবস্থার অংশ মনে করা হয় না। ফলে কোনো মিত্র হিসেবে নয়, বরং অস্থিরতার সময়ে ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে বিভাজন তৈরির একটি অস্থায়ী ঘুঁটি হিসেবে তিনি বিদেশি শক্তির কাছে বিবেচ্য হয়ে থাকতে পারেন। অতীতে ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও, ক্ষমতা ছাড়ার পর তিনি আবার সেই একই ব্যক্তিদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন। এই অবস্থান পরিবর্তনের প্রবণতা তাঁর রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ। বাস্তবিক অর্থে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্কের প্রমাণ না থাকলেও, এই নতুন প্রতিবেদনটি ইরানের রাজনীতিতে আহমাদিনেজাদের জটিল অবস্থানকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

 

সূত্র: বিবিসি বাংলা

 

ডিবিসি/এফএইচআর

আরও পড়ুন