ইরানের বিরুদ্ধে চলমান পাঁচ মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রায় সব নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ করে ফেলেছে। অভ্যন্তরীণ তথ্যের বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্রের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। অত্যাধুনিক এসব অস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসায় ভবিষ্যতের যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতির সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, মজুত শেষ হয়ে যাওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে মূলত রয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনীর স্থল থেকে স্থলে নিক্ষেপযোগ্য ‘আর্মি ট্যাকটিক্যাল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা’ (অ্যাটাকামস) এবং ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্র’ (পিআরএসএম)। এর মধ্যে দুটি সূত্র দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র এসব অস্ত্রের প্রায় পুরো অংশই ব্যবহার করে ফেলেছে। এসব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন অস্ত্রাগারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা নিরাপদ দূরত্ব থেকে শত্রুপক্ষে নিখুঁত হামলা চালানোর সুবিধা দেয়। ১০ লাখ ডলারেরও বেশি মূল্যের এসব অস্ত্র চীনের মতো বড় দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও অতি জরুরি। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এসব অস্ত্রের মজুত ঠিক কতটা রয়েছে, সে বিষয়ে সূত্রগুলো কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন চালান। শুরুতে সংঘাতটি স্বল্পস্থায়ী হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হলেও তা দীর্ঘায়িত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের কাছে থাকা স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রায় সবই শেষ করে এনেছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে পুনরায় তা পূরণের প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের ভেতরের সূত্রমতে, এসব অস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসার মূল কারণ হলো ট্রাম্প প্রশাসনের ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল। পাইলটসহ যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ফেলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
অস্ত্রাগারের এই ঘাটতির বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে হোয়াইট হাউস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি অস্ত্র রয়েছে এবং তাদের যা প্রয়োজন, তার চেয়েও তা অনেক বেশি। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা অনুযায়ী তা যেকোনো সময় ও স্থানে প্রয়োগের পূর্ণ সামর্থ্য তাদের রয়েছে। অন্যদিকে অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ও রায়থন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্দিষ্ট কিছু সামরিক সরঞ্জাম এখন রেকর্ড পরিমাণে তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের গতি এখনো অনেক কম। পিআরএসএম নতুন অস্ত্র হওয়ায় শুরু থেকেই এর মজুত কম ছিল, তবে ২০২৭ সালের জন্য বিপুল পরিমাণ ফরমাশ দেওয়া হয়েছে।
আক্রমণাত্মক অস্ত্রের পাশাপাশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ও থাডের মতো প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুতও কমে আসছে। সিএসআইএসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়ে গেছে। এছাড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী থাড ব্যবস্থার মজুত যুদ্ধ শুরুর পরিস্থিতির চেয়ে অন্তত ৩৮ শতাংশ কমে গেছে।
সামরিক প্রধানেরা কয়েক সপ্তাহ ধরেই এসব প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে আসছিলেন। গত সপ্তাহে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সামরিক উপদেষ্টাদের এই সতর্কবার্তার পর ট্রাম্প ইরানের অভ্যন্তরে নতুন করে আর কোনো বড় আক্রমণ না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। যদিও একজন মার্কিন কর্মকর্তা এই তথ্য অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপের কারণেই ট্রাম্প পরবর্তী হামলা স্থগিত রাখার পথ বেছে নিয়েছেন।
সূত্র: রয়টার্স
ডিবিসি/এফএইচআর