ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের লক্ষ্যের পেছনে প্রধানত দুটি উদ্দেশ্য কাজ করে বলে ধারণা করা হয়: প্রথমত ইসরায়েলকে হুমকি দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত বিশ্বকে সতর্ক করা যে, ইরানে আক্রমণ করলে শত্রুকে চড়া মূল্য চোকাতে হবে। তবে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের ওপর হুমকি কিছুটা কমলেও হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের অবিচল নিয়ন্ত্রণ ভিন্ন এক বার্তা দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মারওয়ান মুয়াশার মন্তব্য করেছেন, ইরান আবিষ্কার করেছে যে পারমাণবিক বোমার চেয়েও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য বেশি কার্যকর।
বর্তমানে এই জলপথটি যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ইরানি সামরিক বাহিনী ও তাদের ছায়াশক্তিরা ট্যাংকারে আক্রমণ চালাচ্ছে এবং একটি টোল ব্যবস্থার মাধ্যমে জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে। রবিবার (৬ এপ্রিল) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ইরানকে প্রণালি খুলে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অন্যথায় তাদের চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে। অথচ এর কয়েক দিন আগেই ট্রাম্প ইতিবাচক সুরে বলেছিলেন, ইরানকে তেল বিক্রি করতে হবে বলেই প্রণালিটি স্বাভাবিকভাবে খুলে যাবে। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সমাপ্তির পথে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চরম আঘাত হানবে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন কখনোই স্পষ্টভাবে বলেনি যে এই যুদ্ধের মূল কারণ হরমুজ প্রণালি মুক্ত রাখা, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব হোয়াইট হাউজকে সংকটে ফেলেছে। এমনকি প্রণালিটি না খুলেই যুদ্ধ শেষ করার বিষয়টিও বর্তমানে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান এই নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে নারাজ এবং তারা এটিকে নিজেদের ‘পানামা খাল’ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। কার্নেগি বিশ্লেষক করিম সাজাদপুর জানান, এটি পুরো বিশ্বের জন্যই অগ্রহণযোগ্য। ইরান এখন সামরিক যুদ্ধের বদলে ‘রাজনৈতিক সহনশীলতা ও টিকে থাকার’ যুদ্ধে মনোযোগ দিয়েছে। তারা যে কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুনর্নির্মাণের জন্য হাজার কোটি ডলার দাবি করছে। এছাড়া জ্বালানি বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের বদলে অন্য মুদ্রার ব্যবহার বাড়িয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রতিটি ট্যাংকার থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আদায় করছে, যা থেকে তাদের দৈনিক আয় কোটি কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
গত সপ্তাহে ইরানি নেতারা স্থায়ীভাবে টোল আদায়ের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট জাহাজের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইরানি আইনপ্রণেতা মোহাম্মদরেজা রেজাই কুচি বিষয়টিকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ট্রানজিট ফি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে যায়, যা বিশ্বের মোট ব্যবহারের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপার এক বৈঠকে জানিয়েছেন, ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ দখল করেছে। তিনি আরও জানান, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে ইরান জাহাজে ২৫টির বেশি আক্রমণ চালিয়েছে এবং প্রায় দুই হাজার জাহাজে ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছেন।
গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি মনে করেন, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান দ্রুত তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন প্রোগ্রাম ফের গুছিয়ে নিতে সক্ষম। মারওয়ান মুয়াশার সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্প যদি প্রণালিটি না খুলেই যুদ্ধ ত্যাগ করেন, তবে অন্য কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে শক্তি প্রয়োগ করে তা খোলার সক্ষমতা বা সদিচ্ছা নেই। ফলে আরব বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করার পুরোনো কৌশল এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন টাইমস
ডিবিসি/এফএইচআর