ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। শুক্রবার (১ মে) সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, “এখনও আলোচনা চলছে, কিন্তু আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছি না।”
ট্রাম্প সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তার হাতে এখন দুটি পথ খোলা আছে- “হয় তাদের (ইরান) পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া, না হয় একটি চুক্তিতে আসা।” তিনি প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও জানান যে, ইরান এমন কিছু দাবি করছে যা তার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
ওয়াশিংটনে ট্রাম্প ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ বা যুদ্ধকালীন ক্ষমতা আইনের ৬০ দিনের সময়সীমা মানতে অস্বীকার করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, ৬০ দিনের বেশি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তবে ট্রাম্প এক চিঠিতে কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ইরানের সাথে বিদ্যমান সাময়িক যুদ্ধবিরতি এই সময়সীমার ঘড়িটি থামিয়ে দিয়েছে। যদিও অনেক আইন বিশেষজ্ঞ তার এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছেন। ট্রাম্প এই আইনটিকে অসাংবিধানিক বলেও অভিহিত করেন।
ইরানি সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতে প্রস্তাবটি পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পাকিস্তান সরকার এই প্রস্তাবকে তাদের দীর্ঘদিনের ‘ব্যাক-চ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি’ বা নেপথ্য কূটনীতির ফলাফল হিসেবে দেখছে। ইসলামাবাদ মনে করছে, একটি শান্তি চুক্তি অত্যন্ত সন্নিকটে।
তবে পাকিস্তানের জন্য এটি কেবল আঞ্চলিক শান্তির প্রশ্ন নয়, বরং দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যুদ্ধের কারণে পাকিস্তানের মাসিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গত এক মাস ধরে ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইরানের ভেতরে এই প্রস্তাব দেওয়া নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক চলেছে। তেহরানের কট্টরপন্থীদের একটি অংশ মনে করছিল, প্রস্তাব না দিয়ে হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রাখাই বেশি কার্যকর হবে। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনও অনড়। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় শুক্রবার সতর্ক করে দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য ইরানকে কোনো ধরনের টোল বা ফি দিলে সেই জাহাজ কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
শান্তি আলোচনার মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ট্রাম্প চাইছেন ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মতে, আগামী ১০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার একটি ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া ইরানের মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তাদের মিত্র দেশ রাশিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়ার একটি প্রস্তাবও টেবিলে রয়েছে, যা নিয়ে ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে কথা বলেছেন।
পাকিস্তানের ইন্সটিটিউট অফ রিজিওনাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট জওহর সালিম বলেন, ইরান হয়তো সময়ক্ষেপণ করে ভালো কোনো ডিল পাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রকেও বুঝতে হবে যে তাদের দীর্ঘদিনের চাপ প্রয়োগের কৌশল ইরানের ক্ষেত্রে সফল হয়নি। একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে উভয় পক্ষের জন্যই তা উইন-উইন বা লাভজনক হতে হবে।
এখন সবার নজর ১৪ ও ১৫ মে চীনে অনুষ্ঠিতব্য ট্রাম্প-শি জিনপিং সম্মেলনের দিকে। তেহরান আশা করছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগেই ট্রাম্প এই সংঘাতের একটি সমাধান চাইবেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
ডিবিসি/এসএফএল