ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের জেরে ভারতে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী বৈঠক শেষে কোনো যৌথ ঘোষণা বা বিবৃতি প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকস। এই যুদ্ধ জোটের বেশ কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্রকে সরাসরি প্রভাবিত করছে বলে জানা গেছে।
জোটের বর্তমান সভাপতি হিসেবে ভারত নয়াদিল্লিতে এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করেছিল। ব্রিকসের মূল সদস্য দেশগুলো হলো-ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এছাড়া নতুন সদস্য হিসেবে এতে যুক্ত হয়েছে ইথিওপিয়া, মিশর, ইরান, ইন্দোনেশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।
স্বাগতিক ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। এর আগে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ব্রিকস সদস্য দেশগুলোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এর বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
চলমান এই যুদ্ধ ইরান এবং তার উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যার মধ্যে সৌদি আরব এবং ব্রিকস-এর নতুন সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাতও রয়েছে। তবে রিয়াদ (সৌদি আরব) এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই ব্লকে যোগ দেয়নি।
একটি সংবাদ সম্মেলনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে আরাগচি বলেন, ব্রিকসের একটি সদস্য দেশ ভারতের তৈরি করা খসড়া যৌথ বিবৃতির কিছু অংশ আটকে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান বারবার তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং ইসরায়েলসহ অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে আরাগচি দাবি করেন, ওই নির্দিষ্ট দেশের সাথে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই, বর্তমান যুদ্ধে তারা আমাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল না। আমরা কেবল তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে আঘাত করেছি।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধি ও প্রতিমন্ত্রী খলিফা বিন শাহীন আল মারার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি আরাগচির বিরুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলার যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন। আল মারার জানান, ইরান ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল এবং ড্রোনের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৩,০০০ বার হামলা চালিয়েছে।
যৌথ বিবৃতি দিতে ব্যর্থ হলেও, ভারতের পক্ষ থেকে একটি পৃথক সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে ব্রিকস সদস্যদের কিছু ঐকমত্যের ক্ষেত্র তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের মতো বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলোতে জরুরি সংস্কারের আহ্বান। জোটটি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের দীর্ঘদিনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধ নিয়েও আলোচনা করেন। তারা একমত হন যে, গাজা যেকোনো ভবিষ্যৎ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা অবরুদ্ধ এই উপত্যকাকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে অধিকৃত পশ্চিম তীরের সাথে একীভূত করার ওপর জোর দেন। তবে এই বিবৃতির ক্ষেত্রেও একটি নাম না জানা দেশ গাজা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদের কিছু বিষয়ে আপত্তি প্রকাশ করেছে।
এছাড়া, জোটটি লেবাননে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার জন্য সমস্ত পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে কোনো দেশকে এককভাবে দায়ী না করে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বলপ্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে যেকোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
বৈঠকের এজেন্ডায় আফ্রিকার দেশ সুদান পরিস্থিতিও গুরুত্ব পায়। জাতিসংঘ সুদানের বর্তমান অবস্থাকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছে। ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সেখানে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানই তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটকাতে পারে। তারা সতর্ক করেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সুদান চরমপন্থা ও সন্ত্রাসের উর্বর ভূমিতে পরিণত হতে পারে।
পাশাপাশি সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদের পতনের মধ্য দিয়ে দেশটির গৃহযুদ্ধ কার্যত শেষ হওয়ার পর এখন সিরিয়া পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারতের বিবৃতিতে সেখানে একটি শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হয়েছে। নেতারা সিরিয়ায় বিদেশি সন্ত্রাসী যোদ্ধা নির্মূল করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, তারা সিরিয়া এবং সামগ্রিক অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
সূত্র: আল জাজিরা
ডিবিসি/এসএফএল