জেলার সংবাদ, কৃষি

ইলিশের নতুন প্রজনন এলাকা চিহ্নিত

চাঁদপুর প্রতিনিধি

ডিবিসি নিউজ

বৃহঃস্পতিবার ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০২:৫৬:৪৪ পূর্বাহ্ন
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বলেশ্বর নদী ও মোহনা অঞ্চলের প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে ইলিশের নতুন প্রজনন এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় এটি হবে ইলিশের ৫ম প্রজনন ক্ষেত্র।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ইতিমধ্যে মায়ানী-মীরসরাই, পশ্চিম সৈয়দ আওলিয়া পয়েন্ট-তজুমুদ্দিন, গন্ডামারা-বাঁশখালী এবং লতা চাপালি কলাপাড়া এলাকার মোহনা অঞ্চলে আরও ৪টি প্রজনন এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। নতুনভাবে বলেশ্বর নদীর প্রায় ৫০ কি.মি. দৈর্ঘ্য এবং ৩৪৮ বর্গ কি.মি. বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে পশ্চম প্রজনন ক্ষেত্রের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এম এ বাশার বলেন, ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮-২০২১ মেয়াদে বলেশ্বর নদীতে ইলিশ মাছের প্রজনন ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইনস্টিটিউটের ইলিশ বিজ্ঞানীরা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। গবেষণায় জাটকার প্রাচুর্যতা, পানির ভৌত-রাসায়নিক গুণাগুন, প্লাংকটন ও গাট কনন্টেট, মাছের শ্রেণি-দৈর্ঘ্য, প্রতি ইউনিটে মাছ ধরার প্রচেষ্টা, প্রজননত্তোর ইলিশের হার পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার তথ্যমতে, বলেশ্বর নদী ও মোহনা অঞ্চলে পানির গুণাগুন ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজননের জন্য অনুকূলে রয়েছে। বিশেষ করে বলেশ্বর নদীর মোহনা অঞ্চল ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীটির মোহনা অঞ্চল হাব (কেন্দ্রস্থল) আকারে বিস্তৃত। এই হার দিয়ে বলেশ্বর ছাড়াও বিষখালী, পায়রা, আন্ধারমানিক ও লতাচাপালী নদীতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ বঙ্গোপসাগর থেকে নদীর উজানে প্রবেশ করে। এই নদীর পূর্ব অংশে সুন্দরবনের নদী ও খালসমূহ (ভোলা নদী, বেতমোরি গাঙ, সুপতি খাল, দুধমুখী খাল ও ছোট কটকা খাল) সংযুক্ত রয়েছে। বলেশ্বর নদী হয়ে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ এসব খাল ও নদীতে প্রবেশ করে।

প্রস্তাবিত প্রজনন এলাকার মধ্যে বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার বগী বন্দর থেকে বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার পক্ষীরচর সংলগ্ন পয়েন্ট পর্যন্ত এবং পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা থেকে পটুয়াখালী (বরগুনা জেলার সীমানা সংলগ্ন) জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালী ইউনিয়নের লেবুর বাগান পয়েন্ট পর্যন্ত।

গবেষকরা তাদের তিন বছরের গবেষণালদ্ধ ফলাফল অনুযায়ী প্রস্তাবিত প্রজনন এলাকায় বছরওয়ারী ডিমওয়ালা মাছের সংখ্যা যথাক্রমে ৬৫, ৬৯ এবং ৫১ শতাংশ, ডিম ছাড়ারত (ওজিং) মাছের সংখ্যা যথাক্রমে ৪৯, ৫৫ এবং ৪৩ শতাংশ এবং ডিম ছেড়ে দেওয়া (স্পেন্ট) মাছের সংখ্যা যথাক্রমে ৪৫, ৫০ এবং ৪০ শতাংশ নির্ণয় করেন। এছাড়াও প্রজননত্তোর ইলিশ মাছের হার যথাক্রমে ৪৫, ৫০ এবং ৪০ শতাংশ শনাক্ত করা হয়। একইভাবে নিষিক্ত ডিমের সংখ্যা যথাক্রমে ৩ হাজার ৮২২, ৪ হাজার ৫০৮ এবং ২ হাজার ৬৬৬ কেজি নিরুপণ করা হয়।

এ জন্য ইলিশসহ অন্যান্য মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বলেশ্বর নদীতে প্রজনন ক্ষেত্র দ্রুতই ঘোষণা করা প্রয়োজন। বলেশ্বর নদী ও মোহনা অঞ্চল প্রজনন ক্ষেত্র ঘোষণা ও সুরক্ষা করা হলে প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন অধিক ইলিশ উৎপাদিত হবে। যার বাজার মূল্য প্রায় ২৬৪ কোটি টাকা।

নদী কেন্দ্র, চাঁদপুর-এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান জানান, আমাদের গবেষক দল দীর্ঘ তিন বছর সেখানে গবেষণা করে বলেশরী বলেশ্বর নদীসহ আশেপাশের এলাকাটিকে প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এ পর্যন্ত যে কয়টি স্থানকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে তার উপকার আমরা পাচ্ছি। সময়ের সাথে সাথে বৈশ্বিক আবহাওয়া ও প্রকৃতির অনেক পরিবর্তন ঘটে। তারই প্রেক্ষিতে এখন এলাকাটিকে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানটি একেবারে সুন্দরবন সংলগ্ন। স্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্রস্থল। বর্তমানে ওই স্থানটি সংরক্ষণ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগেও বলেশ্বর নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। তবে তখন সেখানে ইলিশ ছিল অরক্ষিত। তাই প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেখানেও অভয়াশ্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাছাড়া অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলে সেখানকার স্থানীয় মানুষ ও জেলেরা আরও সচেতন হবে এবং তাদেরকে সরকারি প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হবে। বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী নদী হলেও বলেশ্বর নদীর ইলিশ মিঠাপানির ইলিশ হিসেবেই গণ্য করা হবে। কারণ ইলিশ সাধারণত মিঠাপানিতে প্রজননের উদ্দেশ্যে আসে।

এই ইলিশ গবেষক আরও জানান, আমরা একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি তবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম থেকে সেখানে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে কিছু অফিশিয়াল কার্যক্রম রয়েছে যা এখনও সম্পন্ন হয়নি।

উক্ত স্থানটিকে যদি সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা যায় তাহলে শুধু ইলিশ নয় সকল প্রজাতির দেশি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। সেক্ষেত্রে সকল প্রজাতির মাছ ডিম ছাড়ার এবং নিরাপদে বিচরণ করার সুযোগ পাবে। তাহলে আনুমানিক ২৬৪ কোটি টাকার উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।

আরও পড়ুন