বাংলাদেশে মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি ইয়াবার মারাত্মক আগ্রাসন অগণিত মানুষের জীবন ধ্বংস করছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের প্রায় ৫ শতাংশই বর্তমানে মাদকে আসক্ত। নতুন সিনথেটিক মাদকের বিস্তার এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলতি মাসে সংসদে মাদকসংক্রান্ত কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিলও অনুমোদন করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কঠোর শাস্তি নয়, এই সংকট নিরসনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
রাজধানী ঢাকার চল্লিশোর্ধ্ব এক বাসিন্দা, যিনি ‘মেটালফ্রিক’ ছদ্মনাম ব্যবহার করে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, তিনি ইয়াবার ধ্বংসাত্মক প্রভাবের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। একসময় যিনি পোষা পাখির যত্ন নিতেন, তিনি এখন নিজের অগোছালো ঘরে একাকী সময় কাটান। তিনি জানান, ইয়াবা তাঁর মনমানসিকতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। এই মাদক সেবনকারীদের টানা তিন দিন জাগিয়ে রাখার পর চরম ক্লান্তি নিয়ে ১২ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে বাধ্য করে। সস্তা ও দামি, এই দুই ধরনের ইয়াবা এখন বাজারে সহজলভ্য, যা সেবনকারীদের দাঁতের ক্ষতি থেকে শুরু করে স্ট্রোক বা খিঁচুনির মতো মারাত্মক শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের মতো এলাকায় রাস্তায় খুব সহজেই তরুণদের ইয়াবা বিক্রি করতে দেখা যায়, যা আফিম বা হেরোইনের মতো পুরোনো মাদকগুলোকে পুরোপুরি হটিয়ে দিয়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং নিরাময় পুনর্বাসন কেন্দ্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আরিফুজ্জামান জানান, দেশে অন্যান্য মাদকের পাশাপাশি ইয়াবার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। সারা দেশে মাত্র ৩৫০ জনের মতো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যা চাহিদার তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন এমন প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ কোনো চিকিৎসা নেন না। ডা. আরিফুজ্জামান উল্লেখ করেন, বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। পরবর্তীতে মাদকের খরচ জোগাতে আসক্তদের অনেকেই আবার মাদক কারবারি হয়ে ওঠেন। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা মহামারির মতো বাহ্যিক সংকটগুলোও মানুষকে মাদকের দিকে ধাবিত করতে ভূমিকা রাখে।
মাদক ও অপরাধবিষয়ক জাতিসংঘের দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আসা ইয়াবার প্রধান উৎস হলো মিয়ানমার। থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওস সীমান্তের ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ সিনথেটিক মাদক উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। দেশে ইয়াবাকে ‘ক-শ্রেণির’ নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১৮ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছিল। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের মাদকবিরোধী যুদ্ধের আদলে চালানো সেই অভিযানে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে ৪৬৬ জন নিহত হন। আতঙ্ক ছড়ানো এবং বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ সে সময় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পতন ঘটে এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়লাভ করে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্ন মধ্যম আয়ের এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এই দেশের তরুণদের অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মারাত্মক দুশ্চিন্তায় ভোগেন। মেটালফ্রিকের মতো আসক্তদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত জীবনের উত্থান-পতন মাদকাসক্তিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। ইয়াবা মানুষকে ‘মিথ্যা আত্মবিশ্বাস’ দেয় এবং সেবনকারীদের অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী করে তোলে। তাঁর মতে, এই মাদক সেবনকারীদের ঘুম পুরোপুরি কেড়ে নিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, যা মূলত এক ধরনের ধীরগতির বিষপ্রয়োগ।
সূত্র: দ্য আইরিশ টাইমস
ডিবিসি/এফএইচআর