হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ সংগ্রাম এখন ইসরায়েলি প্রকল্পকে ভেঙে চুরমার করার পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং দখলদার বাহিনীর সামনে লেবাননের সমস্ত ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে পিছু হটা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটির মহাসচিব শেখ নাইম কাসেম।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) এক টেলিভিশন ভাষণে শেখ নাইম কাসেম বলেন, আমরা এখন লেবানন, এর প্রতিরোধ বাহিনী, সেনাবাহিনী, জনগণ এবং ভবিষ্যতের ইতিহাসে এক নতুন যুগে পদার্পণ করেছি, যার নাম ইসরায়েলি প্রকল্প ধূলিসাৎ করার পর্যায়। তিনি উল্লেখ করেন, গত দুই থেকে তিন বছর ধরে হিজবুল্লাহকে সামরিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও মানবিক সব দিক থেকে নির্মূল করার যে নীলনকশা ইসরায়েল তৈরি করেছিল, তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।
হিজবুল্লাহ প্রধান বলেন, এর অর্থ এই নয় যে তারা আর চেষ্টা করবে না বা অন্য কোনো পর্যায় আসবে না। তবে হিজবুল্লাহর অস্তিত্ব মুছে দিয়ে গ্রেটার ইসরায়েল বা বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার যে মূল পরিকল্পনা ছিল, তা আমরা ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছি।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক চুক্তির কথা উল্লেখ করে শেখ কাসেম বলেন, লেবাননের মাটিতে এক ইঞ্চি জায়গাও ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অধীনে রাখা হবে না। বর্তমানে একটি যুদ্ধবিরতি চলছে। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এই সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করতে হবে। কোনো অজুহাতে বা কোনো শর্তে লেবাননের এক ইঞ্চি জমিও ইসরায়েল নিজের দখলে রাখতে পারবে না। তাদের সম্পূর্ণভাবে বিদায় নিতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার পরই কেবল লিটানি নদীর দক্ষিণে লেবাননের জাতীয় সেনাবাহিনী একচ্ছত্রভাবে মোতায়েন করা হবে। একই সাথে তিনি জল, স্থল ও আকাশপথে সব ধরনের ইসরায়েলি আগ্রাসন স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবি জানান।
এই যুদ্ধ জয়ের পেছনে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দৃঢ়তার কথা স্মরণ করে শেখ কাসেম বলেন, আমাদের যোদ্ধারা যদি রণক্ষেত্রে অটল না থাকত, তবে আমরা এই ফলাফল পেতাম না।
তিনি হিজবুল্লাহর শহীদ নেতা সাইয়েদ হাসান নাসরুল্লাহ, অন্যান্য শহীদ, আহত, বন্দি এবং তাদের পরিবারগুলোর আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের চেয়ে শক্তিশালী নয়-এমন সমালোচকদের জবাব দিয়ে তিনি বলেন, রণক্ষেত্রে ইসরায়েলি সত্তা বেশিদিন টিকতে পারে না এবং সময় পার হলেও তারা তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।
হিজবুল্লাহ প্রধান এই লড়াইয়ে ইরানের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, ইরানের সমর্থনেই হিজবুল্লাহর সক্ষমতা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকের প্রথম দফাতেই লেবাননের ওপর আগ্রাসন বন্ধের শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি বলেন, ইরান লেবাননের হয়ে সরাসরি কোনো আলোচনা করছে না, বরং তারা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো লেবাননবাসীর ওপরই ছেড়ে দিয়েছে। তবে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে লেবানন কর্তৃপক্ষের আলোচনার ধরণ নিয়ে কিছুটা সমালোচনা করেন তিনি।
এদিকে, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে পঞ্চম দফার বৈঠক গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে শুরু হয়েছে। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন জানিয়েছেন, এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের সম্পূর্ণ অবসান ছাড়া বৈরুত কোনো কিছু মেনে নেবে না।
বিপরীতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অনড় অবস্থানে থেকে দাবি করেছেন যে, ইসরায়েলি বাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করবে।
উল্লেখ্য, গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পর পাকিস্তান ও কাতার একটি ডি-কনফ্লিকশন সেল বা সংঘাত নিরসন সেল গঠন করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও লেবানন যুক্ত রয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত মঙ্গলবারও নাবাতিহ আল-ফাওকা গ্রামে ইসরায়েলি গুলিতে ২ জন নিহত হয়েছেন। লেবানন সরকারের হিসাব মতে, গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৪,১০০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
সূত্র: প্রেস টিভি
ডিবিসি/এসএফএল