মাত্র কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোটি কোটি তরুণের সমর্থন পেয়ে সাড়া জাগানো ভারতীয় যুব সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবার রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশের অংশ হিসেবে এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা।
ভারতের ১.৪২ বিলিয়ন জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি যুবসমাজ। রাজনীতি, বেকারত্ব এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে দেশের তরুণদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই সংগঠন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে মূলত সাম্প্রতিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে বড় ধরনের ত্রুটির বিষয়গুলোর দিকে নজর দিয়েছেন, যা লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ারকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
সম্প্রতি নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে এক পোস্টে অভিজিৎ দিপকে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানাতে আমি ভারতে ফিরে আসছি। দিল্লীতে একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য তরুণদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের কাছ থেকে জবাবদিহিতা চাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার আমাদের রয়েছে, তা আমাদের প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি আরও জানান, শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে ইতিমধ্যে প্রায় ৮ লাখ শিক্ষার্থী একটি অনলাইন পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন। তবে এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রী বা সরকারের কোনো মুখপাত্রের তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংগঠনটির নাম ককরোচ (তেলাপোকা) রাখার পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ ঘটনা। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশের বেকার যুবকদের একাংশকে তেলাপোকা'র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। যদিও পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, তিনি সাধারণ তরুণদের সমালোচনা করেননি, বরং ভুয়া ও জাল ডিগ্রিধারী ব্যক্তিদের বুঝিয়েছেন। প্রধান বিচারপতির সেই মন্তব্যের প্রতিবাদ ও ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় এই ককরোচ জনতা পার্টি। বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে এই সংগঠনের অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখেরও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদীর ১২ বছরের শাসনামলে অনলাইনে এত বড় গণ-অসন্তোষ আগে দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনে মোদীর দল জয়ী হলেও, এই আন্দোলন তার ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হানতে পারে। বিশেষ করে ইরানের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাস সংকটের ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।
এর সাথে যোগ হয়েছে তীব্র বেকারত্ব সমস্যা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৯.৯%, যা দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হারের (৩.১%) চেয়ে তিন গুণেরও বেশি।
গত মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে মেডিকেল কোর্সের আন্ডারগ্রাজুয়েট প্রবেশিকা পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার। এতে শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি এড়াতে ডাক বিভাগের পরিবর্তে ভারতীয় বিমান বাহিনীকে ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র পরিবহনের পরিকল্পনা করছে মোদী সরকার।
পাশাপাশি, সিজেপি-র ওপর ডিজিটাল সেন্সরশিপও চালানো হচ্ছে। সংগঠনটির অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টটি ইতিমধ্যেই ব্লক করে দিয়েছে ভারত সরকার। প্রতিষ্ঠাতা দিপকে জানিয়েছেন, অজ্ঞাত হ্যাকারদের হাত থেকে তাদের ইনস্টাগ্রাম পেজটি উদ্ধার করতে হয়েছে তাদের।
এদিকে সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কিরেন রিজিজু সিজেপি-র বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেছেন, এই সংগঠনটি চিরশত্রু পাকিস্তান এবং ভারত-বিরোধী চক্র থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার সংগ্রহ করছে। তবে এই পুরো বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেননি।
বিদেশে থাকলেও দেশে ফেরার পর গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা করছেন দিপকে। তিনি বলেন, আমার পরিবার এবং বন্ধুরা উদ্বিগ্ন যে আমি ভারতে ফিরলে গ্রেপ্তার হতে পারি। কিন্তু আমরা আর কতদিন এভাবে ভয়ের মধ্যে বাঁচব? সমস্ত বাধা উপেক্ষা করেই তিনি রাজপথে আন্দোলন সফল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
সূত্র: রয়টার্স
ডিবিসি/এসএফএল