রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং মা পারভীন আক্তার। মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামির উপস্থিতিতে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় রামিসার বাবা-মা আদালতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠার পর ১০টা ৩৯ মিনিটে প্রথমে বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা সাক্ষ্য দেন। এরপর বেলা ১১টা ২ মিনিটে সাক্ষী সেলে নেওয়া হয় মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী রামিসার মা পারভীন আক্তারকে। আদালত ঘটনার তারিখ জানতে চাইলে তিনি জানান, ঘটনাটি ছিল গত ১৯ মে-র। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হয়। এর কিছুক্ষণ পর পারভীন আক্তার পাশের ফ্ল্যাট থেকে একটি বাচ্চার চিৎকারের শব্দ পেলেও প্রথমে ভেবেছিলেন সেটি অন্য কোনো বাচ্চার কণ্ঠ। এর ৩-৪ মিনিট পর বড় মেয়ে রাইসা একা বাসায় ফিরলে রামিসার খোঁজ শুরু হয়। বিড়াল খুঁজতে রামিসা নিচে গেছে ভেবে নিচে খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি তারা দোতলা ও তিনতলার ব্যাচেলর বাসায় যান। তিনতলার ফ্ল্যাটে ধাক্কাধাক্কি করলেও ভেতর থেকে দরজা খোলা হয়নি।
পারভীন আক্তার আদালতে আরও জানান, একপর্যায়ে তিনি ওই ফ্ল্যাটের সামনে নিচে মেয়ের একটি জুতা দেখতে পান। এরপর অন্যান্য তলার বাসিন্দা ও প্রতিবেশীদের ডেকে এনে জোরে ধাক্কাধাক্কি করলেও দরজা না খোলায় তাঁর স্বামীকে খবর দেওয়া হয়। পরে ১০-১২ জন লোক জড়ো হয়ে তালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকে বাথরুমের সামনে প্রচুর রক্ত এবং রুমের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ পড়ে থাকতে দেখেন তারা। এ সময় মামলার আসামি স্বপ্নাকে ঘরের ভেতরেই হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যায়। রামিসার মা বলেন, ‘আমি তাকে অনেকবার বলেছি বোন দরজাটা খুলে দে, তোর কিছু হবে না। সে দরজা খোলেনি।’ পরে পুলিশ এসে রামিসার জামাকাপড়সহ যাবতীয় আলামত জব্দ করে এবং জব্দ তালিকায় মায়ের স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
এরপর ভুক্তভোগী রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তার শিশু হওয়ায় ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে তার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান গত ২৪ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে এই চার্জশিট জমা দেন এবং একই দিনে ট্রাইব্যুনাল দুই আসামি সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগপত্র আমলে নেন। এর আগে গত সোমবার আদালত এই দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন এবং রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হওয়ার সমন জারি করেন। আজ ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক, আলামত সংগ্রহকারী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রতিবেশীদেরও সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, নিহত রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে স্বপ্না কৌশলে তাকে রুমে ডেকে নিয়ে যায়। পরে তাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বড় বালতির ভেতর তার কাটা মাথা উদ্ধার করা হয়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে তথ্য পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয় এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে মূল আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে। এই নৃশংস ঘটনায় ২০ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন।
ডিবিসি/এফএইচআর