পারিবারিক সম্মান রক্ষার নামে হত্যা , জোরপূর্বক বিয়ে ও নানাবিধ সামাজিক চাপ প্রতিরোধে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সুইডেন। দেশটির পার্লামেন্ট ‘রিকসডাগ’ সম্প্রতি কাজিনদের (চাচাতো, মামাতো, খালাতো ও ফুফাতো ভাইবোন) মধ্যে বিয়ের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস করেছে। ইতোমধ্যেই গত ১ জুলাই থেকে দেশটিতে এই নতুন আইন কার্যকর হয়েছে।
সুইডিশ পার্লামেন্টের অফিশিয়াল বিবৃতি অনুযায়ী, বিয়ে সংক্রান্ত এই নতুন আইনে বেশ কিছু কঠোর রদবদল আনা হয়েছে:
কাজিনদের পাশাপাশি এক ব্যক্তির সঙ্গে অন্যজনের ভাই বা বোনের সরাসরি বংশধরদের বিয়ের পথও আইনিভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
আগে সৎ ভাইবোন এবং দত্তক নেওয়া ভাইবোনদের মধ্যে বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে বিয়ের যে আইনি সুযোগ ছিল, সেটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে।
দেশের বাইরে সম্পন্ন হওয়া কোনো কাজিন বিয়ে এখন থেকে সুইডেনে সাধারণ নিয়মে আর আইনি বৈধতা বা স্বীকৃতি পাবে না।
সুইডেনের বিচারমন্ত্রী গুনার স্ট্রোমার এই আইনি সংস্কারের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, পরিবার নিয়ন্ত্রিত জোরপূর্বক বিয়ের প্রথা ভাঙতে এই আইন রাষ্ট্রকে বড় ধরনের সহায়তা করবে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কাজিন বিয়েগুলো পারিবারিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। তরুণ-তরুণীরা এতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের পারিবারিক সহিংসতার শিকার হতে হয়, যা চরম পর্যায়ে তথাকথিত ‘অনার কিলিং’-এ রূপ নেয়। এই নিপীড়নের চক্র ভেঙে সমাজকে জোরজবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং পাকিস্তানে কাজিন বিয়ের প্রচলন ব্যাপক। ইউরোপের নর্ডিক দেশগুলোর অভিবাসী সমাজেও এর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এ ধরনের বিয়েতে জন্ম নেওয়া শিশুদের হৃদরোগ ও বিকাশজনিত নানা জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বেশি থাকে।
একসময় সুইডেনের মূলধারার রাজনীতিতে কাজিন বিয়ের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে চলা হতো। তবে মজার বিষয় হলো, অভিবাসী পটভূমি থেকে আসা নেতারাই প্রথম এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। ইরানি বংশোদ্ভূত সাবেক সুইডিশ এমপি হানিফ বালি দীর্ঘকাল ধরে এই প্রথা বাতিলের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছিলেন।
বিপরীতে, দেশটির বৃহত্তম বিরোধী দল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস এই আইনের নেতিবাচক সমালোচনা করেছে। দলটির নারী সংগঠনের নেত্রী আনিকা স্ট্র্যান্ডহাল এর প্রবল বিরোধিতা করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্দিষ্ট কিছু অভিবাসী ভোটার গোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রাখতেই তাদের এই অবস্থান।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ হেনরিখের গবেষণার সূত্র ধরে বলা যায়, সমাজে কাজিন বিয়ে কমে গেলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বৃদ্ধি পায়। পশ্চিমা দেশগুলোতে এই প্রথা বন্ধ হওয়ার কারণেই উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয়েছিল, যা মানুষকে বাইরের দুনিয়ার সাথে সহযোগিতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ শিখিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সুইডেন সরকারও এই আইনের মাধ্যমে সমাজে সেই নাগরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থাকে আরও সুদৃঢ় করতে চাইছে।
ডিবিসি/এমকেএ