কানাডাজুড়ে ৮৫৮টি সক্রিয় দাবানল জ্বলছে, যার ফলে সৃষ্ট ধোঁয়ার কারণে এখন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বায়ু মানের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স প্রোগ্রাম অনুযায়ী, মিশিগান ও মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের উত্তরভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বাতাসকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এক বার্তায় জানিয়েছে, এই সতর্কতা আপার মিডওয়েস্ট, গ্রেট লেক অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। কানাডার উত্তর ওন্টারিওতে একটি দাবানলের কারণে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সেখানকার একজন প্রধান জানিয়েছেন, তার পুরো এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
কানাডিয়ান ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কানাডায় ৮৫৮টি সক্রিয় দাবানল জ্বলছে, যার মধ্যে বৃহস্পতিবারই নতুন করে ৩০টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সিংহভাগ আগুনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ওন্টারিও-র উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় বড় দাবানলগুলোর কারণে থান্ডার বে এবং টরন্টো জুড়ে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে ও বাতাসের মান খারাপ হয়েছে। এছাড়া বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ধোঁয়ার কম ঘনত্ব গ্রেট লেক এবং নিউইয়র্কের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে, যার ফলে আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন দেখানোর পাশাপাশি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় আকাশ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি লালচে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে, বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বাতাসের মান খুবই অস্বাস্থ্যকর বলে বিবেচনা করা হয়েছে। শহর কর্তৃপক্ষ তাপপ্রবাহের জরুরি পরিকল্পনা বাড়িয়েছে এবং বায়ু মান নিয়ন্ত্রণে জরুরি প্রোটোকল চালু করেছে। যার ফলে শহরজুড়ে শত শত কুলিং সেন্টার এবং কেএন৯৫ মাস্কের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ওন্টারিওতে আগামী কয়েকদিন বজ্রঝড় হতে পারে, তবে সেই বৃষ্টি আগুন নেভানোর জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা বাতাস যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের রাজ্যগুলোতে ধোঁয়া বয়ে নিয়ে যাবে। ফলে এই ধোঁয়া নিউ জার্সিতেও চলে যেতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তবে সোমবারের (২০ জুলাই) মধ্যে বাতাসের দিক পরিবর্তন হতে পারে, যার ফলে ধোঁয়া কুইবেকের দিকে চলে যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণভাগের বায়ু মানের উন্নতি হবে।
সুইজারল্যান্ডের বায়ু মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ার জানিয়েছে, মধ্য-পশ্চিমের শহর ডেট্রয়েটের বাতাস বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে রয়েছে। এর পরেই রয়েছে মিনিয়াপোলিস, শিকাগো এবং টরন্টো। টানা তৃতীয় বছরের মতো এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে আরও ভালো ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়ে রাজ্যের চারজন প্রতিনিধি স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, একটি বছর পার হয়ে গেছে, ঋতুটি আবার ঘুরে এসেছে, কিন্তু আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই পরিবর্তন হয়নি। অন্যদিকে, কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হুকস্ট্রা বুধবার এক বিবৃতিতে কিছুটা কূটনৈতিক সুর বজায় রেখে দাবানল নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের অগ্নিযোদ্ধাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন।
ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন ওন্টারিও’র ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ের অধ্যাপক লরা চ্যাসমার জানান, কানাডার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক জীবনচক্রের অংশই হলো এই দাবানল, তবে ২০১৫ সালের পর থেকে এটি ঘন ঘন ঘটছে। তিনি বলেন, এটি জলবায়ু উষ্ণায়ন এবং মাটির উপরিভাগ শুকিয়ে যাওয়ার সাথে সম্পর্কিত।
অধ্যাপক চ্যাসমার আরও জানান, অতীতে দাবানলগুলো সাধারণত পশ্চিম কানাডায় বেশি দেখা যেত, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা পূর্ব দিকে চলে এসেছে। এখন ওন্টারিও, কুইবেক এবং আটলান্টিক অঞ্চলের প্রদেশগুলোতে বড় বড় আগুন জ্বলছে, যার কারণে টরন্টো এবং নিউইয়র্কের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে ধোঁয়া বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি কানাডার ফায়ারফাইটারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, কারণ তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে আগুন যেন লোকালয়ে না ছড়ায়। আগুনের তীব্রতা ও বিস্তৃতির কারণে তা পুরোপুরি নেভানো খুবই কঠিন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী কার্নি বৃহস্পতিবার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করার দায়িত্ব দুই দেশেরই রয়েছে। তিনি আরও জানান, তার সরকার বিভিন্ন প্রদেশ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে। এদিকে, ওন্টারিও’র প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড তার সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, মাঠে ১৫০টিরও বেশি ফায়ার ক্রু আগুন নেভানোর কাজ করছে। ফোর্ড বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যত টাকা লাগবে, আমরা ততটাই খরচ করব।
ঝুঁকিপূর্ণ ধোঁয়ার পাশাপাশি, উত্তর ওন্টারিও’র দাবানলের কারণে স্থানীয় ফার্স্ট নেশনস সম্প্রদায়ের কয়েক ডজন মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ভিডিওতে দেখা গেছে, অনেকে নৌকা দিয়ে সেই দুর্গম এলাকা থেকে পালিয়ে আসছেন।
ফার্স্ট নেশনস এর প্রধান হেলেন পাভোলা স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সিটিনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ওপর থেকে বিমান মারফত দেখা গেছে যে তার পুরো এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সবাই বাড়িঘর চলে গেছে, সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, কানাডার দাবানলের ধোঁয়া নিয়ে আমেরিকার এই দোষারোপের খেলা মূল সমস্যাটিকে আড়াল করছে।
সূত্র: বিবিসি
ডিবিসি/আরপিডি