কালজয়ী কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ

কামরুল ইসলাম

ডিবিসি নিউজ

মঙ্গলবার ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২০ ০২:২১:২০ অপরাহ্ন
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতমদের এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার সমকালীন সময়ে ব্রাহ্মণ ও জমিদার শাষিত সমাজে বাংলার সাধারণ মানুষ কেমন ছিল তা নিখুঁতভাবে তুলে ধরেন এই সাহিত্যিক। যেন সমাজের সাধারণ মানুষেই তার গল্পের নায়ক। আজ তার জন্মদিন।

কখনো কেরানি, কখনো হিসাবরক্ষক, ধানের ব্যবসার ব্যবস্থাপক, হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক, কখনো জমিদারবাড়ির গাইয়ে-বাজিয়ে কত ধরনের পেশাতেই না জড়িয়েছেন তিনি। কখনো ঘর-সংসার ছেড়ে নিয়েছেন সন্ন্যাস জীবন। কখনো আড্ডা, অভিনয় আর খেলাধুলায় মেতেছিলেন। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার সাহিত্যকর্ম জয় করেছে সময়কে। ফুটে উঠেছে সমাজের বৈরতা। তিনি কালজয়ী সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ও মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। পাঁচ ভাই আর বোনের মধ্যে শরৎচন্দ্র ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর ডাক নাম ছিল ন্যাড়া।

পাঁচ বছর বয়সেই পাঠশালায় গিয়েছিলেন। অভাব অনটনে নানা স্কুল বদল করে করে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে ভর্তি হন। দারিদ্র্যের কারণে স্কুলের ফি দিতে না-পেরে এই বিদ্যালয়ও ত্যাগ করেন। এই সময় তিনি 'কাশীনাথ' ও 'ব্রহ্মদৈত্য' নামে দুটি গল্প লেখেন। পরে অবশ্যই তিনি এনট্রান্স পরীক্ষা পাস করে তার মাতামহের ছোটো ভাই অঘোরনাথের দুই পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ও গিরীন্দ্রনাথকে প্রতি রাতে পড়াতেন, তার বিনিময়ে অঘোরনাথ তার কলেজে পড়ার প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাতেন। এতৎসত্ত্বেও এফএ পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে না-পেরে শিক্ষাজীবনের ইতিটানেন তিনি।

তার মতো কথা সাহিত্যিকের একাডেমিক পড়াশোনারেই বা কী প্রয়োজন! যার দৃষ্টি শক্তির প্রকরে ফুটে উঠবে সমাজের অসংগতি তিনি তো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রতিবেশী বিভূতিভূষণ ভট্টের বাড়িতে অনুষ্ঠিত এক সাহিত্যসভার অনুপ্রেরণায় তিনি বড়দিদি, 'দেবদাস', চন্দ্রনাথ, শুভদা ইত্যাদি উপন্যাস এবং 'অনুপমার প্রেম', আলো ও ছায়া, 'বোঝা', হরিচরণ' ইত্যাদি গল্প রচনা করেন।

মূলত শরৎচন্দ্র লেখালেখির প্রেরণা পিতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। যখন তিনি স্কুলের নিচের ক্লাসে পড়তেন সে সময় স্কুলের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি তার পিতার আলমারির দরাজ খুলে গল্পের বই বের করে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তেন। শরৎ লেখালেখিতে সব সময় বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ ও অনুকরণ করতে চেয়েছিলেন। রবিঠাকুরের লেখা শরৎচন্দ্র এতটাই পছন্দ করতেন যে, রবীন্দ্রনাথের বেশভূষা পর্যন্ত অনুকরণ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতেন। আর সেটা করতে গিয়ে তিনি রবিঠাকুরের মতো বড় বড় চুলও রেখেছিলেন।

শরৎ এক চিঠিতে লিখেছিলেন '‘১৪ বছর ধরে ১৪ ঘণ্টা ধরে পড়ছি। সেই যে কলেজ জীবনের পরীক্ষা দিতে পারেনি কেবল সেই রাগে।" রাগে হোক আর অনুরাগে হোক পড়ার ব্যাপারে শরৎ ছিলেন খুবেই আগ্রহী। রেঙ্গুনে শরৎ প্রথমত বার্নাড ফ্রি লাইব্রেরি নামক একটি লাইব্রেরিতে পড়তেন এবং এই লাইব্রেরির নিয়মিত মেম্বার ছিলেন।  কিছুদিন তিনি অফিসের পর লাইব্রেরিতে চলে যেতেন এবং লাইব্রেরিতে অনেক রাত অবধি পড়াশোনা করতেন।

রেঙ্গুনে যাওয়ার পূর্বে শরৎচন্দ্র বেশকিছু গল্প, উপন্যাস লিখে সমাজে লেখক খ্যাতি পেয়েছিলেন। তার পাঠকপ্রিয় গল্প উপন্যাসের মধ্যে- 'বড়দিদি', 'চন্দ্রনাথ', 'শুভদা', 'দেবদাস', 'কাশীনাথ' এবং 'চরিত্রহীন'র প্রথমাংশ অন্যতম।  এক যুগেরও বেশি সময় রেঙ্গুনে অবস্থান করে শরৎচন্দ্র ফিরে আসেন কলকাতায় এবং নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে নিয়োজিত করেন সাহিত্য সাধনায়। এর পরের শুধু ইতিহাস। শরৎচন্দ্র একে একে সৃষ্টি করতে থাকেন কালজয়ী সব উপন্যাস। এদের মধ্যে, 'শ্রীকান্ত', 'গৃহদাহ', 'পথের দাবি', 'দত্তা', 'বিরাজ বৌ', 'বিপ্রদাস' অন্যতম।

তার সাহিত্য-কর্মকে ঘিরে ভারতীয় উপমহাদেশে এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশটি চলচ্চিত্র বিভিন্ন ভাষায় তৈরি হয়েছে।  তার মধ্যে 'দেবদাস' উপন্যাসটি বাংলা, হিন্দি এবং তেলেগু ভাষায় ১৬টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

শেষ বয়সে কোন না কোন রোগে ভুগছিলেনই। এই জ্বরে ভোগেন তো আবার যকৃতে সমস্যা।  পরে যকৃতের রোগটি পাকস্থলী পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। বিধানচন্দ্র রায়, কুমুদশঙ্কর রায় প্রমুখ চিকিত্সক তার অস্ত্রোপচারের পক্ষে মত দেন। চিকিত্সার জন্য তাকে প্রথমে দক্ষিণ কলকাতার সাবার্বান হসপিটাল রোডের একটি ইউরোপীয় নার্সিং হোমে ও পরে ৪ নম্বর ভিক্টোরিয়া টেরাসে অবস্থিত পার্ক নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়। ১৯৩৮ সালের ১২ জানুয়ারি শল্যচিকিৎসক ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় তার দেহে অস্ত্রোপচার করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। চার দিন পর ১৬ জানুয়ারি সকাল ১০টায় শরৎ চন্দ্র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আরও পড়ুন