যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার নিজে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়ার আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পদত্যাগের কথা ঘোষণা করে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।
রবিবার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার পদত্যাগ করবেন। এছাড়া তিনি আরও বলেন যে, অভিবাসন এবং জ্বালানি নীতিতে স্টারমার "নিদারুণভাবে ব্যর্থ" হয়েছেন। পোস্টের শেষে ট্রাম্প যুক্ত করেন: আমি তাকে শুভকামনা জানাই!
গত মে মাসে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির চরম পরাজয়ের পর থেকেই স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে জল্পনা চলছিল। গত শুক্রবার তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী, গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম পার্লামেন্টের একটি শূন্য আসনের বিশেষ নির্বাচনে জয়লাভ করার পর স্টারমারের নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ আরও জোরালো হয়।
রবিবার এর আগেই ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল যে স্টারমার পদত্যাগের কথা ভাবছেন। কিন্তু যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের এই আগ বাড়িয়ে মন্তব্য করা অনেক প্রবীণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষককেও হতবাক করেছে।
আইটিভির সাংবাদিক রবার্ট পেস্টন এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, এমন কোনো সীমানা নেই যা এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভেঙে ফেলবেন না।
পেস্টন একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে আরও জানান যে, ট্রাম্পের এমন আগাম খবর দেওয়া সত্ত্বেও স্টারমার "এখনও পদত্যাগের কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। অন্যদিকে ব্রডকাস্টার পিয়ার্স মরগান এটিকে স্টারমারের জন্য "চূড়ান্ত অপমান" বলে আখ্যায়িত করেছেন।
রবিবার সন্ধ্যায় ডাউনিং স্ট্রিট দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে স্টারমার এবং ট্রাম্পের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কীভাবে এমন একটি চূড়ান্ত ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন নাও হতে পারে। রবিবার সন্ধ্যায় লেবার পার্টির একজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা দ্য পোস্টকে জানিয়েছেন, দলের কিছু সংসদ সদস্যকে "ব্রিফ করা হচ্ছে যে তিনি আগামীকাল পদত্যাগ করবেন এবং তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তার অবস্থান আর ধরে রাখা সম্ভব নয়।" নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা আরও বলেন, স্টারমার তার সহকর্মীদের "আস্থা হারিয়েছেন" এবং এখন তার "সরে দাঁড়ানোই সঠিক সিদ্ধান্ত।"
ট্রাম্প যেভাবেই এই পদত্যাগের খবর পেয়ে থাকুন না কেন, ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে তার সম্পর্ক ক্রমশই খারাপ হচ্ছে। সম্প্রতি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ তুলেছেন। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে মেলোনি তার সাথে ছবি তোলার জন্য "অনুরোধ" করেছিলেন।
স্টারমার এবং ট্রাম্পের সম্পর্কও কয়েক মাস ধরে ভালো যাচ্ছে না। চলতি বছরের শুরুর দিকে, ইরানের ওপর মার্কিন হামলার প্রতি যুক্তরাজ্যের সমর্থন না জানানোয় ট্রাম্প স্টারমারকে "উইনস্টন চার্চিল নন" বলে কটাক্ষ করেছিলেন। গত সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনেও এই দুই নেতার মধ্যে কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়নি।
মাত্র দুই বছর আগে (২০২৪ সালে) লেবার পার্টিকে বিপুল ভোটে জয় এনে দিয়েছিলেন স্টারমার। কিন্তু সম্প্রতি স্থানীয় নির্বাচনে লেবার ও কনজারভেটিভদের বিশাল পরাজয় এবং ব্রেক্সিটের রূপকার নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি দল রিফর্ম ইউকের উত্থানের পর, নিজ দলের ভেতর থেকেই তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হচ্ছে।
গত শুক্রবার স্টারমার যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার শপথ নিলেও এরপর থেকে তিনি প্রকাশ্যে আর কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য করেননি। রবিবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেবল বাবা দিবস নিয়ে মন্তব্য করে লেখেন, বাবা হওয়া আমার জীবনের এক বিশাল আনন্দের বিষয়।
বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমার পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি এখন আর মূল প্রশ্ন নয়; বরং কীভাবে এবং কখন করবেন, সেটাই দেখার বিষয়। লেবার পার্টি কি সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের মতো নেতাদের নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে, নাকি একক কোনো উত্তরসূরির প্রতি সমর্থন জানাবে, তা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।
অ্যান্ডি বার্নহাম এখন স্টারমারের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। গত সপ্তাহের বিশেষ নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে-র প্রার্থীর বিরুদ্ধে তার চূড়ান্ত বিজয় লেবার আইনপ্রণেতাদের আশা জোগাচ্ছে যে, বার্নহাম দলের সাম্প্রতিক হতাশাজনক রেটিং পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।
২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকেই যুক্তরাজ্যের রাজনীতি চরম অস্থিতিশীল। স্টারমার যদি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের ঘোষণা দেন, তবে এক দশকের মধ্যেই ব্রিটেন তার সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে পাবে।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
ডিবিসি/এমএনকে