জেলার সংবাদ

কুড়িগ্রামে রাতে নিখোঁজ গৃহবধূ, সকালে তেঁতুল গাছের মগডাল থেকে উদ্ধার

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

ডিবিসি নিউজ

বুধবার ৬ই মে ২০২৬ ০২:০৪:৫০ অপরাহ্ন
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

কুড়িগ্রামের উলিপুরে নিখোঁজের প্রায় ‌১২ ঘণ্টা পর এক নারীকে প্রায় ২৫ ফুট উঁচু একটি তেঁতুল গাছের মগডাল থেকে উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। বুধবার (৬ মে) সকালে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করা হয়। ওই নারী আনন্দবাজারের বাসিন্দা আবু সাইদের স্ত্রী।

জানা গেছে, গতরাত রাত ১০টায় ওই নারী ঘর থেকে নিখোঁজ হন। এরপর তাকে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুজি করে কোথাও পাওয়া যায়নি।  পরে আজ বুধবার সকালে বাড়ির কাছে একটি পুকুর পাড়ের লম্বা তেঁতুল গাছের মগডালে তাকে কখনো বসে বা কখনো শুয়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। এতে এলাকায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এসময় এ দৃশ্য দেখতে সেখানে ভিড় করেন এলাকার অনেক মানুষ।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সকাল ১০টার দিকে তাকে গাছের মগডালে বসে কিছু একটা খেতে দেখা যায়। এসময় তার ছেলে গাছে উঠতে চেষ্টা করলে তাকে নিষেধ করে সে। পরে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারীরা গিয়ে তাঁকে নামানোর চেষ্টা করলে তাদেরও তিনি নিষেধ করেন। এক পর্যায়ে ওই নারী গাছ থেকে পানিতে লাফিয়ে পরলে অজ্ঞান অবস্থায়  পুকুর থেকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।

 

এ ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি রায়হান কবির বলেন, ৪০ বছর বয়সী ওই নারী ইতিপুর্বেও বাঁশ গাছসহ বিভিন্ন গাছের মগডালে উঠেছিল। তিনি যে ধরনের গাছের মগডালে আরোহন করতেন, সেটি একজন পুরুষের পক্ষেও সম্ভব নয়। আমার জানামতে, তিনি একজন জ্বিনের আছরের রোগী বলে এলাকায় শ্রুত রয়েছে।

 

রায়হান কবির আরও দাবি করেন, প্রায় ২৫ ফুট উঁচু গাছের মাথা থেকে পানিতে পড়ার সময় পানিতে সামান্য শব্দও পাওয়া যায়নি। কিন্তু আমরা যখন তাকে পানি থেকে উদ্ধার করি তখন তাকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তার বাড়ীতে পৌঁছে দেয়া হয়।

 

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, এই ধরনের ঘটনা আমাদের সমাজে অনেক সময় অলৌকিক বা "জ্বীনের আছর" বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা শাস্ত্রের কাছে এগুলো যৌক্তিক। তবে তিনি বলেছেন- এ ধরনের আচরণের প্রধানত দুইটি বৈজ্ঞানিক কারণ হতে পারে:

 

১. স্লিপওয়াকিং (Sleepwalking) বা ঘুমের মধ্যে হাঁটা

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে Sonnambulism বলা হয়। এটি একটি 'প্যারাসমনিয়া' (Parasomnia) ডিসঅর্ডার।


কি ঘটে: ঘুমের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে (সাধারণত গভীর ঘুমে) মানুষের মস্তিষ্ক আংশিক জেগে ওঠে, কিন্তু শরীর পুরোপুরি সচেতন হয় না। এই অবস্থায় ব্যক্তি হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে, এমনকি জটিল কাজ যেমন-রান্না করা বা উঁচু কোনো জায়গায় উঠে পড়াও সম্ভব।

 

বিপত্তি: স্লিপওয়াকাররা সাধারণত চোখ খোলা রাখলেও তাদের চেতনার অভাব থাকে। তারা কোথায় যাচ্ছে বা কি করছে সে সম্পর্কে তাদের কোনো স্মৃতি থাকে না। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তারা সাধারণত কিছু মনে করতে পারে না এবং নিজেকে অদ্ভুত জায়গায় আবিষ্কার করে ভীষণভাবে অবাক বা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

 

২. ডিজোসিয়াটিভ ডিসঅর্ডার (Dissociative Disorder)

 

মনোবিজ্ঞানে অনেক সময় একে Dissociative Identity Disorder বা সহজ ভাষায় 'হিস্টেরিয়া' বলা হয়ে থাকে। কারণ যখন একজন মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক চাপ বা পারিবারিক অবদমন সহ্য করেন, তখন তার মস্তিষ্ক বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি ভিন্ন পর্যায়ে চলে যায়।

 

আচরণ: এই অবস্থায় ব্যক্তি নিজের অজান্তেই এমন সব কাজ করে ফেলেন যা তার স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের বাইরে। উঁচু গাছে ওঠা বা অদ্ভুত শব্দ করা এই মানসিক অসুস্থতার একটি লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় একে "পজেসন" (Possession) বা আছর করা মনে করা হয় কারণ ব্যক্তির আচরণের ওপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না।


কেন অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়?


গাছে ওঠার মতো শারীরিক পরিশ্রমের পর যখন ব্যক্তির স্বাভাবিক চেতনা ফিরে আসে, তখন অতিরিক্ত ভয় বা ক্লান্তিতে তার স্নায়ুতন্ত্র (Nervous System) সাময়িকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে, যার ফলে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।

 

এ পরিস্থিতিতে করণীয়:

 

এই ধরনের পরিস্থিতিতে ওই মহিলার ওপর কোনো কবিরাজি চিকিৎসা বা ভয় দেখানোর মতো কাজ করা একদমই উচিত নয়। তাকে দ্রুত একজন নিউরোলজিস্ট (Neurologist) বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist) দেখানো প্রয়োজন। সঠিক কাউন্সেলিং এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।


এটি অলৌকিক কিছু নয় বরং একটি চিকিৎসাযোগ্য স্নায়বিক বা মানসিক সমস্যা।

 

কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক চাপ (ট্রমা), বা পারিবারিক অবদমনে থাকা যে কেউ এ ধরনের কাজ করতে পারে। এ ধরনের রোগীকে পারিবারিকভাবে কেয়ার নেয়ার পাশাপাশি অতি দ্রুত মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

 

 

আরও পড়ুন