কোলোরেক্টাল ক্যান্সার সারা পৃথিবীব্যাপী তৃতীয় প্রধান একটি ক্যান্সার এবং মৃত্যুর কারণ হিসেবে দ্বিতীয়। কোলোরেক্টাল ক্যান্সার (Colorectal Cancer) বা কোলন ও রেক্টামের ক্যান্সার হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হল পারিবারিক ইতিহাস। যদি পরিবারের কারও এই ক্যান্সার হয়ে থাকে, তাহলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কি কি লক্ষণ দেখলে বুঝবো এটি পারিবারিক ক্যান্সার-
-দুই তার অধিক আত্মীয় যদি একই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়
-অনেকগুলো প্রজন্ম যদি আক্রান্ত হয়
-কম বয়সে যদি ক্যান্সার সনাক্ত হয়
-একজন ব্যক্তি যদি একের অধিক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়
-একটি পরিবারে যদি কোনো ক্যান্সার হয় যা জেনেটিক্যালি সম্পর্কিত (যেমন স্তন এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার, বা কোলন এবং জরায়ু ক্যান্সার)
-যদি দুর্লভ ধরনের ক্যান্সার হয়।
পারিবারিক ইতিহাস ও ঝুঁকি বৃদ্ধির কারন-
১. পরিবারের নিকট আত্মীয়দের ক্যান্সার থাকলে ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় যেমন:
-যদি প্রথম ডিগ্রি আত্মীয়দের (বাবা, মা, ভাই, বোন, সন্তান) মধ্যে কারও কোলোরেক্টাল ক্যান্সার থাকে, তাহলে ঝুঁকি দ্বিগুণ বা ততোধিক হতে পারে।
-যদি এই ক্যান্সার ৫০ বছরের কম বয়সে কারও হয়ে থাকে, তাহলে ঝুঁকি আরও বেশি।
-যদি একাধিক আত্মীয়ের কোলন ক্যান্সার থাকে, তাহলে জেনেটিক কারণের সম্ভাবনা আরও বেশি।
২. বংশগত (জেনেটিক) ক্যান্সার সিনড্রোম:
-কিছু নির্দিষ্ট জেনেটিক অবস্থার কারণে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
-লিঞ্চ সিনড্রোম (বংশগত ননপলিপোসিস কোলোরেক্টাল ক্যান্সার-HNPCC)
এটি কোলন ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ বংশগত কারণ-
-এই সিনড্রোম থাকলে ৫০-৮০% ক্ষেত্রে কোলোরেক্টাল ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
-সাধারণত ৪৫ বছর বা তার কম বয়সে এই ক্যান্সার হতে পারে।
-পারিবারিক অ্যাডেনোমাটাস পলিপোসিস(FAP)।
-এটি বিরল কিন্তু গুরুতর বংশগত সমস্যা, যেখানে শত শত বা হাজার হাজার পলিপ কোলন ও রেক্টামে গঠিত হয়।
-পারিবারিক অ্যাডেনোমাটাস পলিপোসিস থাকলে প্রায় ১০০% ক্ষেত্রে ক্যান্সারে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যদি আগেভাগে চিকিৎসা না করা হয়।
-সাধারণত ১৬-২০ বছর বয়সের মধ্যেই পলিপ তৈরি হয় এবং ৩০-৪০ বছরের মধ্যে ক্যান্সারে পরিণত হয়।
পারিবারিক কোলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রতিরোধ ও ঝুঁকি কমানোর উপায়:
১. নিয়মিত স্ক্রিনিং করা:
সাধারণ ব্যক্তিদের জন্য ৫০ বছর বয়সের পর কোলনোস্কোপি শুরু করা উচিত।
আর যদি পারিবারিক ইতিহাস থাকে:
৪০ বছর বয়সের পর বা পরিবারের ক্যান্সার আক্রান্ত সদস্যের বয়সের ১০ বছর আগে থেকে স্ক্রিনিং করা উচিত।
লিঞ্চ সিনড্রোম থাকলে ২৫ বছর বয়স থেকে কোলনোস্কোপি করানো দরকার (প্রতি ১-২ বছর অন্তর)।
পারিবারিক অ্যাডেনোমাটাস পলিপোসিস থাকলে ১০-১৫ বছর বয়স থেকে স্ক্রিনিং করা উচিত।
- ২. স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা অনুসরণ করা:
উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া, যেমন ফলমূল, শাকসবজি ও সম্পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার।
লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া
নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।
ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা, কারণ এগুলো ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। - ৩. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা:
লিঞ্চ সিনড্রোম থাকলে আংশিক বা সম্পূর্ণ কোলন আপারেশনের মাধ্যমে অপসাসন করা হয় এবং পারিবারিক অ্যাডেনোমাটাস পলিপোসিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কোলন সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করে দেওয়া হয়, যাতে ক্যান্সারে পরিণত না হয়।
পরীক্ষা ও নির্ণয়:
•মাইক্রোস্যাটেলাইট অস্থিরতা (MSI) টেস্ট
•ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি (IHC) টেস্ট
•জেনেটিক টেস্টিং (উপরোক্ত জিনগুলোর মিউটেশন আছে কিনা তা নির্ণয়ের জন্য)
উপসংহার:
যদি পরিবারে কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে, তাহলে আগেভাগে সচেতন হওয়া, স্ক্রিনিং করানো এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা অনুসরণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ধরা পড়লে চিকিৎসার সফলতা অনেক বেশি হয়। এজন্য পরিবারের ইতিহাস থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
লেখক:
ডা. মো. একরামুল হক জোয়ার্দ্দার
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমএস (ক্যান্সার সার্জারি), এফআইসিএস (আমেরিকা)
মেম্বার অব আমেরিকান কলেজ অফ সার্জনস।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ সার্জন,
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা।
ডিবিসি/এএনটি