আন্তর্জাতিক

খাদ্যসংকটে আফ্রিকান পেঙ্গুইন; ক্ষুধার জ্বালায় বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছে পাথর!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

৮ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

চরম খাদ্যসংকটে পড়েছে আফ্রিকান পেঙ্গুইনরা। ক্ষুধার জ্বালায় তারা বাচ্চাদের পাথর খাওয়াতে বাধ্য হচ্ছে। অ্যান্টার্কটিকার পেঙ্গুইনদের চেয়ে কিছুটা ছোট আকৃতির এই আফ্রিকান পেঙ্গুইনরা মূলত দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার নাতিশীতোষ্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে। দক্ষিণ আফ্রিকার বেটিস বে-র উপকূলে রোদ পোহানো সাদা পেটের এই আকর্ষণীয় পাখিরা প্রতিবছর হাজারো পর্যটককে মুগ্ধ করলেও, তাদের অস্তিত্ব এখন চরম হুমকির মুখে।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) আফ্রিকান পেঙ্গুইনকে ‘চরম বিপন্ন’ প্রজাতির তালিকাভুক্ত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে বন্য পরিবেশে এদের প্রজননক্ষম জোড়ার সংখ্যা ১০ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। গত তিন দশকে দূষণ, আবাসস্থল ধ্বংস এবং তীব্র খাদ্যসংকটের কারণে এদের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলীয় পাখি সংরক্ষণ সংস্থা ‘সানকব’ (SANCCOB), যা ১৯৬৮ সাল থেকে সামুদ্রিক পাখি রক্ষায় কাজ করছে, জানিয়েছে যে বন্য পরিবেশে এই প্রাণীরা এখন বেঁচে থাকার জন্য এক চরম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

 

আফ্রিকান পেঙ্গুইনদের প্রধান খাদ্য হলো সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভির মতো ছোট ঝাঁকবদ্ধ মাছ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাণিজ্যিক প্রয়োজনে অতিরিক্ত মৎস্য শিকারের ফলে সমুদ্রে এই মাছগুলোর জোগান আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বন, মৎস্য ও পরিবেশ দফতর এবং যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে রবিন ও ডাসেন দ্বীপে যা দেশটির অন্যতম প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র ছয় হাজারের বেশি পেঙ্গুইন কেবল অপুষ্টির কারণেই মারা গেছে। গত দুই দশকে সার্ডিন মাছের সংখ্যা আগের তুলনায় মাত্র ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে এবং নামিবিয়ার উপকূলে তা প্রায় বিলুপ্তির পথে।

 

সানকবের গবেষক আলবার্ট স্নাইম্যান ল্যাবে মৃত পেঙ্গুইন ছানাদের পাকস্থলী পরীক্ষা করে পাথর খুঁজে পেয়েছেন। তিনি জানান, তীব্র ক্ষুধার তাড়নায় মা-বাবা পেঙ্গুইনরা তাদের ছানাদের পাথর খাওয়াতে বাধ্য হয়েছে। এই পাথরগুলো পুষ্টি শোষণে বাধা সৃষ্টি করায় শেষ পর্যন্ত ছানারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সানকবের পুনর্বাসন কেন্দ্রে গত বছর ৯৪৮টি পেঙ্গুইন আনা হয়, যার অধিকাংশই ছিল মারাত্মক দুর্বল। একটি প্রাপ্তবয়স্ক পেঙ্গুইনের স্বাভাবিক ওজন ৪ কেজি হওয়ার কথা থাকলেও, সেখানে ১.৯ কেজি ওজনের পেঙ্গুইনও পাওয়া গেছে। খাবারের সন্ধানে অভিভাবকদের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে অনেক সময় ছানারা এতিম হয়ে পড়ছে এবং অনাহারে মারা যাচ্ছে।

 

অপুষ্টির পাশাপাশি জাহাজ চলাচল, তেল ও শব্দ দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, বার্ড ফ্লু, এভিয়ান ম্যালেরিয়া এবং সিল বা হাঙরের আক্রমণ পেঙ্গুইনদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আশার কথা হলো, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকায় ১০ বছরের জন্য ‘নো-টেক জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে মাছ ধরা ও খনন নিষিদ্ধ। এছাড়া সানকবের প্রচেষ্টায় ১০ হাজারের বেশি পরিত্যক্ত পেঙ্গুইনকে সুস্থ করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ২০২১ সালে প্রথম কৃত্রিম সুরক্ষিত পেঙ্গুইন কলোনি স্থাপন করা হয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, পেঙ্গুইনদের এই করুণ পরিণতি পুরো বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে এবং মাছ ধরার কোটা না কমালে এর নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানবজীবনের ওপরেও পড়বে।

 

তথ্যসূত্র: সিএনএন

 

ডিবিসি/এএমটি

আরও পড়ুন