তিল তিল করে কষ্টে জমানো দুই লাখ টাকা। সেই টাকা দিয়ে জমি বন্ধক নিয়ে নতুন করে কৃষিকাজ শুরু করে সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কৃষক তোফাজ্জল হোসেন। কিন্তু ঘরে রাখা সেই সঞ্চয় ইঁদুর ও উইপোকার কবলে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। চোখের সামনে সঞ্চয়ের টাকা নষ্ট হতে দেখে ভেঙে পড়েন তিনি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর এবার অসহায় এই কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছেন সৌদিপ্রবাসী ব্যবসায়ী আলহাজ মিজানুর রহমান সুমন। তিনি কৃষক তোফাজ্জল হোসেনকে নগদ দুই লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছেন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের উত্তর ধুমাইটারি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তোফাজ্জল হোসেনের হাতে এ অর্থ তুলে দেন মিজানুর রহমান সুমনের ছোট ভাই হাবিবুর রহমান জনি।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তর ধুমাইটারি গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন আর স্ত্রী ফাতেমা বেগম মানুষের বাড়িতে রান্নার কাজ করে সংসারে সহায়তা করতেন। দুজনের কষ্টার্জিত উপার্জন থেকে অল্প অল্প করে জমিয়েছিলেন দুই লাখ টাকা। সেই টাকা দিয়ে জমি বন্ধক নিয়ে কৃষিকাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
কিন্তু গত ৯ আগস্ট সকালে জমি বন্ধক নেওয়ার জন্য বাক্সে রাখা টাকা বের করতে গিয়ে তাদের সেই স্বপ্নে নেমে আসে অন্ধকার। বাক্স খুলে দেখা যায়, ইঁদুর ও উইপোকা কেটে টাকাগুলো ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। কষ্টের সঞ্চয় এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন তোফাজ্জল হোসেন ও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম।
তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে দুই লাখ টাকা জমিয়েছিলাম। ঢাকায় রিকশা চালিয়েছি, আমার স্ত্রী মানুষের বাড়িতে রান্নার কাজ করেছে। সেই কষ্টের টাকা ইঁদুর ও উইপোকা কেটে নষ্ট করে ফেলেছে। টাকা নষ্ট হওয়ার পর কীভাবে চলব, তা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম।’
কৃষক তোফাজ্জলের এই করুণ কাহিনি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি নজরে আসে সৌদি আরবপ্রবাসী ব্যবসায়ী আলহাজ মিজানুর রহমান সুমনের। অসহায় কৃষকের কষ্টের কথা জানতে পেরে তার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার বিকেলে নিজের ছোট ভাই হাবিবুর রহমান জনিকে তোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে পাঠান মিজানুর রহমান সুমন। সেখানে গিয়ে কৃষকের হাতে নগদ দুই লাখ টাকা তুলে দেন হাবিবুর রহমান জনি।
এ ব্যাপারে হাবিবুর রহমান জনি বলেন, ‘আমার বড় ভাই সৌদিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। তিনি সবসময় অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। তোফাজ্জল হোসেনের কষ্টের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি তার নজরে আসে। তার নির্দেশেই আমি এখানে এসে তোফাজ্জল ভাইয়ের হাতে দুই লাখ টাকা তুলে দিয়েছি।’
সহায়তার টাকা হাতে পেয়ে দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কেটে গেছে তোফাজ্জল হোসেন ও তার পরিবারের। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন তারা।
তোফাজ্জল হোসেন ও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘এই টাকা পেয়ে আমাদের অনেক চিন্তা দূর হয়েছে। আমরা খুব খুশি। আল্লাহ তায়ালা মিজানুর রহমান ভাইকে নেক হায়াত দান করুন। এই টাকা দিয়ে শেষ বয়সে কিছু করে জীবন চালাতে পারব। আমাদের কষ্টের কথা তুলে ধরায় গণমাধ্যমের প্রতিও আমরা কৃতজ্ঞ।’
তোফাজ্জলের মেয়ে মোরশেদা বেগম বলেন, ‘বাবার কষ্টের টাকা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আমরা খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এখন প্রবাসী ভাইয়ের সহায়তায় আমাদের পরিবার অনেকটা স্বস্তি পেয়েছে। আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ।
কৃষকের এই সহায়তার ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, একটি মানবিক সংবাদ শুধু মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা তুলে ধরেই থেমে থাকে না, কখনো কখনো সেই সংবাদই হয়ে উঠতে পারে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সেতু। তোফাজ্জল হোসেনের হারিয়ে যাওয়া দুই লাখ টাকার ক্ষতি পূরণে প্রবাসী বাংলাদেশির এই উদ্যোগ সত্যি প্রশংসনীয়।
ডিবিসি/এসভিএন