আন্তর্জাতিক

গাজাযুদ্ধে ইসরায়েলকে অস্ত্র দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ ৫১ দেশ!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিবিসি নিউজ

১ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বাইরে যখন ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলছিল, তখন যুদ্ধের বয়স প্রায় ১০০ দিন। সেখান থেকে ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে গাজার কিছু ফিলিস্তিনি ইউটিউবে সরাসরি এই আদালতের কার্যক্রম দেখছিলেন; যদিও বেশির ভাগ মানুষই ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের মধ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিজের কাছে গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনার আবেদন করেছিল।

আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বকারী আইরিশ আইনজীবী ব্লিন নি ঘরালাইঘ জানান, গাজায় প্রতিদিন গড়ে ২৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন, যার মধ্যে ৪৮ জন মা এবং ১১৭ জনের বেশি শিশু রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে 'ডব্লিউসিএনএসএফ' (আহত শিশু, যার কোনও জীবিত পরিবার নেই) এর মতো নতুন সংক্ষিপ্ত শব্দ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি আইসিজে রায় দেয় যে গাজায় গণহত্যার একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে এবং সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি, আদালত গণহত্যা কনভেনশনের পক্ষভুক্ত ১৫৩টি দেশকে গণহত্যা প্রতিরোধে তাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

তবে আইসিজের এই রায়ের পরও ইসরায়েলে অস্ত্রের সরবরাহ অব্যাহত থাকে। কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার মাসব্যাপী এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, আইসিজের সতর্কবার্তার পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে। ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানি তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে জানা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সামরিক সরঞ্জামবাহী ২ হাজার ৬০৩টি চালান ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে, যার মোট মূল্য ছিল ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ইসরায়েলি শেকেল (৮৮৫.৬ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ মূল্যই আইসিজের রায়ের পর রেকর্ড করা হয়েছে।

 

ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে শীর্ষ পাঁচটি উৎস দেশ হলো, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র। আইটিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের সামরিক আমদানির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা মোট ঘোষিত মূল্যের ৪২ শতাংশেরও বেশি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারত সরবরাহ করেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে ইসরায়েলের অস্ত্র-সম্পর্কিত আমদানির প্রায় ১৯ শতাংশের জন্য দায়ী। এমনকি ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অস্ত্রের প্রবাহ থামেনি; ওই বছরের শেষ দুই মাসে ইসরায়েল অতিরিক্ত ৩২৪.৯ মিলিয়ন শেকেল মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে।

 

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের রায়ের পরও যেসব দেশের সরকার ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া অব্যাহত রেখেছে, তারা গণহত্যায় সহযোগিতার জন্য দায়ী হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের ফৌজদারি আইনের অধ্যাপক গেরহার্ড কেম্প বলেন, গাজা এখনও একটি চলমান গণহত্যামূলক অভিযানের বিষয়বস্তু হয়ে রয়েছে এবং গণহত্যা কনভেনশনের আওতায় রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব কেবল গণহত্যার শাস্তি দেওয়া নয়, বরং এটি প্রতিরোধ করাও। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত থাকার সম্ভাব্য বা বাস্তব ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্রগুলোতে অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপে পড়েছে। অনেক রাষ্ট্র অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে বা অস্ত্র বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যে, স্পেনে, কানাডায় এবং ফ্রান্সে জনগণের প্রতিবাদ ও আইনি পদক্ষেপের কারণে সরকারগুলো রপ্তানি নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে। তবে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্টিন ড্রু জানান, অস্ত্র রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ করার আইনি ব্যবস্থার বিকল্প নয়; সরকার চাইলে এখনও রপ্তানি অনুমোদন করতে পারে। প্রধান প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে এবং লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিতাদেশ সমগ্র উৎপাদন লাইনের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে, যার ফলে সরকারগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক চাপ, আইনি ঝুঁকি এবং শিল্প স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে।

 

সূত্র: আলজাজিরা


ডিবিসি/এফএইচআর

আরও পড়ুন