ইসরায়েলি হামলায় বিপর্যস্ত গাজায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জীবনে এখন নতুন এক বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইঁদুরের প্রাদুর্ভাব। ধ্বংসস্তূপ ও ময়লার স্তূপের মাঝে গড়ে ওঠা অস্থায়ী তাবুগুলোতে প্রতি রাতে দলবেঁধে আক্রমণ চালাচ্ছে বড় আকারের ইঁদুর, যার নির্মম শিকার হচ্ছে কোলের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও।
গাজা সিটির একটি তাবুতে ঘুমন্ত অবস্থায় ইনশিরাহ হাজ্জাজ নামের ৬৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার পায়ের আঙুল খেয়ে ফেলেছে ইঁদুর। ডায়াবেটিসের কারণে তিনি শুরুতে টের না পেলেও পরদিন সকালে ক্ষত দেখে আঁতকে ওঠেন। বর্তমানে তিনি বিষক্রিয়া নিয়ে একটি ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি জানান, চারপাশ ময়লা আর ধ্বংসস্তূপে ঘেরা থাকায় তাবুর আশেপাশে শত শত ইঁদুর ঘুরে বেড়ায়, যার ভয়ে তিনি এখন আর শান্তিতে ঘুমাতে পারেন না।
অন্যদিকে, উত্তর-পশ্চিম গাজা সিটির আল-মাকুসি এলাকায় মাত্র ২৮ দিন বয়সী নবজাতক আদাম আল-উস্তাজের মুখ ইঁদুরের কামড়ে রক্তাক্ত হওয়ার ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। মাঝরাতে শিশুর কান্না শুনে বাবা ইউসেফ আল-উস্তাজ মোবাইলের আলো জ্বেলে দেখেন তার ছেলের গাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা শিশুটির মুখে ইঁদুরের দাঁতের গভীর ক্ষত শনাক্ত করেন। গাজার হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে এমন শত শত শিশু ইঁদুরের কামড়ে আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছে। ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিকের তীব্র সংকটের কারণে এই মানবেতর পরিবেশে ইঁদুরের কামড় মানুষের জীবনের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাজার ২২ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখই এখন জীর্ণ তাবুর বাসিন্দা। ইসরায়েলি হামলায় ৮০ শতাংশেরও বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। খোলা জায়গায় জমে থাকা বর্জ্য ইঁদুরের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, পুরো গাজায় বর্তমানে ৬ কোটি টনের বেশি ধ্বংসস্তূপ জমে আছে, যার অর্থ প্রতিটি মানুষ মাথাপিছু প্রায় ৩০ টন ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসবাস করছে। গাজা পৌরসভার মুখপাত্র হোসনি মুহান্না জানান, শুধু গাজা সিটিজুড়েই প্রায় আড়াই কোটি টন ধ্বংসস্তূপ এবং সাড়ে তিন লাখ টন কঠিন বর্জ্য জমে আছে।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (আনরোয়া) সতর্ক করে জানিয়েছে, দ্রুত ইঁদুর দমনের রাসায়নিক সরবরাহ করা না গেলে বাস্তুচ্যুত শিবিরগুলোতে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। ঘরবাড়ি হারানো ইউসেফ আল-উস্তাজের মতো দিশেহারা মানুষরা মনে করছেন, ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার ও অবকাঠামো সংস্কারের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত এই 'ইঁদুর আতঙ্ক' থেকে তাদের কোনো মুক্তি নেই।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
ডিবিসি/এফএইচআর