চলতি মাসের শুরুতে নাইজেরিয়ার ২৩ বছর বয়সী ফার্মাসিউটিক্যাল প্রযুক্তির ছাত্র প্রমিজ ওকোরো যখন তাঁর চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষে বের হচ্ছিলেন, তখন তিনি সাধারণ উদ্যাপনেরই আশা করেছিলেন। বন্ধুদের উল্লাস, গানবাজনা আর সাদা শার্টে সহপাঠীদের শুভেচ্ছাবার্তা লেখার পরিচিত উৎসবের মাঝেই হঠাৎ ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসেন প্রমিজের মা চিনেরি। তাঁর হাতে ধরা ছিল একটি ছাগলের দড়ি। আনন্দঘন এই মুহূর্তটি মুহূর্তেই প্রমিজ ও তাঁর বন্ধুদের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে ওঠে।
শুরুতে চিৎকার শুনে প্রমিজ ভেবেছিলেন কেউ হয়তো কাউকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে। কিন্তু পরে দেখেন, তাঁর মা সযত্নে একটি ছাগল নিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। প্রমিজ জানান, এতে তিনি মোটেও লজ্জিত হননি; বরং আবেগাপ্লুত ও ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন। তাঁর সহপাঠীরাও এ সময় উল্লাসে ফেটে পড়েন। এই ঘটনার ভিডিও অনলাইনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজারো মানুষের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া কুড়ায়। দক্ষিণ-পূর্ব নাইজেরিয়ার বাইরে ছাগল উপহার দেওয়াটা অদ্ভুত মনে হলেও, ইগবো সম্প্রদায়ের কাছে এর গভীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। সেখানে সম্মান ও শুভেচ্ছা জানাতে এবং বিয়ের মতো বিশেষ অনুষ্ঠানে ছাগল উপহার দেওয়ার চল রয়েছে।
প্রমিজের মা চিনেরি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আর্থিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও ছেলেকে দেওয়া কথা রাখতেই তিনি এই উপহারটি দেন। ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় তিনি কথা দিয়েছিলেন, ছেলে যদি কোনো গ্যাং বা খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে থাকে এবং পড়াশোনা চালিয়ে যায়, তবে তাকে পুরস্কৃত করবেন। প্রমিজ ঠিক তা-ই করেছেন। চিনেরি জানান, তাঁর স্বপ্ন ছিল ছেলেকে একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ ফোরম্যাটিক জিপ উপহার দেওয়ার, কিন্তু সামর্থ্য না থাকায় তিনি ১ লাখ ২০ হাজার নাইরা (প্রায় ৮৮ ডলার) দিয়ে এই ছাগলটি কিনেছেন। ইমো রাজ্যের ফেডারেল পলিটেকনিক নেকেডে-তে ছেলেকে চমকে দিতে তিনি নিজেদের গ্রাম উবাহা-এজে থেকে ছাগলটি সঙ্গে নিয়ে এক ঘণ্টারও বেশি পথ পাড়ি দেন।
অনেকেই কৌতূহল প্রকাশ করেছেন যে, প্রমিজ এই ছাগলটি দিয়ে কী করবেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ছাগলটি এখন তাঁর পোষা প্রাণী এবং অত্যন্ত প্রিয়। তাই এটিকে জবাই করে খাওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাঁর নেই। ভবিষ্যতে একটি মাদি ছাগল কিনে এগুলোর প্রজনন ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। আপাতত ছাগলটি ছাত্রাবাসে প্রমিজের সঙ্গেই থাকছে এবং অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রমিজ মজা করে জানান, ছাগলটি মানুষের মতো আচরণ করে এবং তাঁর বেঁচে যাওয়া ফ্রাইড রাইস খুব আগ্রহ নিয়ে খায়। বর্তমানে ছাগলটি রীতিমতো তারকা বনে গেছে। প্রমিজের সঙ্গে এটি সুপারমার্কেটেও যায়, যেখানে অনেকেই এর সঙ্গে ছবি তুলতে ভিড় জমান।
পড়াশোনা শেষে প্রমিজের লক্ষ্য নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতিতে অবদান রাখা। উন্নত জীবনের আশায় অনেক স্বাস্থ্যকর্মী দেশ ছাড়লেও, তিনি দেশেই থেকে মানুষের সেবা করতে চান। নাইজেরিয়ায় উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার হার প্রতি ১০০ জনে মাত্র ১১.৩ জন। তাই প্রমিজের কাছে এই পড়াশোনা শেষ করাটা শুধু সনদের একটি লাইন নয়, বরং একটি বড় মাইলফলক। মায়ের এমন ভালোবাসাপূর্ণ চমকের পর প্রমিজ এখন তাঁকেও একইভাবে চমকে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তবে উবাহা-এজে গ্রাম থেকে মায়ের নিয়ে আসা এই বাদামি ছাগলের চেয়ে বড় কোনো চমক দেওয়াটা তাঁর জন্য সত্যিই কঠিন হবে, যে উপহারটি অনলাইনে হাজারো মানুষকে এক সুতোয় গেঁথেছে।
সূত্র: বিবিসি
ডিবিসি/এফএইচআর