রাজনীতি

গৃহবধূ থেকে গণমানুষের নেত্রী: খালেদা জিয়ার সংগ্রাম, ত্যাগ ও আপসহীন জীবন

মো ফয়সাল হাসান

ডিবিসি নিউজ

৩ ঘন্টা আগে
Facebook NewswhatsappInstagram NewsGoogle NewsYoutube

আজ ১৫ আগস্ট, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং রাজনীতির অবিস্মরণীয় নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী। বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি আজ শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও, তাঁর কর্ম, আপসহীন নীতি এবং মানুষের ভালোবাসা তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠার পথটি তাঁর জন্য মোটেই সহজ ছিল না। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং স্বামী হারানোর শোক বুকে নিয়ে তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগদানের পর তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অকুতোভয় নেতৃত্ব। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও তিনি তাঁর অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র সরে যাননি। তাঁর অনড় ভূমিকার কারণেই ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণআন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি লাভ করেন। এরপর ১৯৯১ সালে তাঁর নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ইতিহাস রচনা করেন। পরবর্তীতে আরও দুবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নারী শিক্ষা, উপবৃত্তি এবং নারীর ক্ষমতায়নসহ দেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

 

ক্ষমতার পাশাপাশি তাঁর জীবন ছিল ব্যক্তিগত বেদনা ও এক মায়ের অসীম ত্যাগের ইতিহাস। ২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক সংকটের সময় তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করা হলেও, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই’ জানিয়ে তিনি দেশেই থেকে যান। সেসময় তিনি এবং তাঁর রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট না থাকা ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোসহ জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন। ২০১০ সালে জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত মইনুল রোডের বাসভবন থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়। এছাড়া সন্তান কোকোর অকাল মৃত্যু তাঁকে এক গভীর শূন্যতায় ফেলে দেয়, যা তিনি নীরবে বহন করেছিলেন।

 

রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্যায়ে ২০১৮ সালে একটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁকে পরিত্যক্ত ও অস্বাস্থ্যকর কারাগারে রাখা হয়। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং দীর্ঘদিন তাঁকে জটিল অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। অবশেষে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি সম্পূর্ণভাবে মুক্তি লাভ করেন।

 

তবে দীর্ঘ কারাবাস ও বয়সজনিত কারণে তাঁর শরীর অনেকটাই ভেঙে পড়েছিল। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ৮০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ৩১ ডিসেম্বর সকালে লাল-সবুজে মোড়ানো তাঁর কফিনের শেষ বিদায়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ পর্যন্ত দল-মত নির্বিশেষে লাখো মানুষের ঢল নামে। অশ্রুসিক্ত মানুষের সেই বিশাল জনসমুদ্রই প্রমাণ করেছিল, তিনি কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন ছিলেন না; বরং বাংলাদেশের অগণিত মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান ছিল অনন্য উচ্চতায়।

 

ডিবিসি/এফএইচআর

আরও পড়ুন