ঘোড়ার গাড়িতে বসে আছেন প্রিয় প্রধান শিক্ষক নূর হায়দার রায়হান, আর অশ্রুসজল চোখে সেই গাড়ির পেছনে ছুটছে বিদ্যালয়ের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার হিলচিয়া ইউনিয়নের ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি এক আবেগঘন ও ব্যতিক্রমী আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই শিক্ষককে অবসরজনিত বিদায় জানানো হয়েছে।
বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজিত এই বিদায় সংবর্ধনায় অংশ নেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। সরিষাপুর গ্রামের বাসিন্দা নূর হায়দার রায়হানকে এভাবে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে বিদায় জানানোর আয়োজনকে সহকর্মী ও স্থানীয়রা এলাকায় নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১৮৭ জন শিক্ষার্থী এবং প্রধান শিক্ষকসহ ১১ জন শিক্ষক রয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানে। ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নূর হায়দার রায়হান এখানে যোগ দেন। এর আগে একাধিক প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ দীর্ঘ ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে অবসরে গেলেন তিনি। সহকর্মীদের মতে, চার দশকের চাকরিজীবনে তিনি কখনো মেডিকেল ছুটি নেননি। সময়ানুবর্তিতা ও শিশুদের প্রতি গভীর মমতার কারণে তিনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের কাছে সমানভাবে ভালোবাসার পাত্র ছিলেন। প্রাক্-প্রাথমিকের শিশুরা অনেক সময় তার কাঁধে চড়ে বসত কিংবা হাত ধরে টেনে ক্লাসে নিয়ে যেত; শিশুদের কাছে তিনি ছিলেন এক পরম বন্ধু।
বিদায় অনুষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সহকর্মী মেরিনা ইয়াসমিন জানান, টানা ১০ বছর একসঙ্গে কাজ করেও তিনি প্রধান শিক্ষককে কোনো দিন দেরিতে বিদ্যালয়ে আসতে দেখেননি। আরেক সহকারী শিক্ষক শ্যামল কান্তি গোস্বামী বলেন, বাজিতপুর উপজেলায় এমন রাজসিক বিদায়ের ঘটনা এই প্রথম এবং সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা মিলে প্রায় এক মাস ধরে এর প্রস্তুতি নিয়েছিল।
বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমানে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মাজহারুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, নূর হায়দার স্যার একজন নীতিবান, মানবিক ও দক্ষ প্রধান শিক্ষক ছিলেন, তাকে প্রাপ্য সম্মানে বিদায় দিতে পেরে এলাকাবাসী গর্বিত। আরেক সাবেক শিক্ষার্থী আলী হাসান তামিমের মতে, পরিবারে মা-বাবার মতোই বিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন একজন বটবৃক্ষসম অভিভাবক। উপস্থিত অভিভাবকেরা অভিমত দেন, একজন আদর্শ শিক্ষকের জন্য এমন রাজকীয় সম্মানই প্রাপ্য।
বিদায়ী বক্তব্যে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নূর হায়দার রায়হান বলেন, শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়, এটি একটি ব্রত। জীবনের শেষ বেলায় এমন ভালোবাসায় সিক্ত হবেন তা কখনো কল্পনাও করেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, তাদের পরিবার এবং এলাকাবাসী যেভাবে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তাতে জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই। একই সঙ্গে তিনি নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের সততা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসার সাথে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং নিজের প্রাণের প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করেন।