যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে একাধিক প্রমাণ পেয়েছে স্থানীয় পুলিশ। ১৬ এপ্রিল বিকেল থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় হিশামের গতিবিধি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার এই রহস্যময় ঘটনার জট খুলতে শুরু করেছে।
১৬ এপ্রিল দুপুরে বৃষ্টির ছাতা মাথায় দিয়ে ইউএসএফ ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে। সেদিন বিকেল ৫টায় এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করার কথা থাকলেও তিনি আর ফেরেননি। লিমনের বন্ধু ওমর হোসাইন তাদের খুঁজে না পেয়ে পুলিশে খবর দেন।
তদন্তকারীরা লিমনের ফোনের সিগন্যাল ট্র্যাক করে দেখতে পান, সেদিন বিকেলে ফোনটি ক্যাম্পাসেই ছিল। কিন্তু রাতের দিকে ফোনটির অবস্থান দেখায় কোর্টনি ক্যাম্পবেল কজওয়ে এবং ক্লিয়ারওয়াটার বিচের স্যান্ড কি পার্ক এলাকায়। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের গোয়েন্দারা লক্ষ্য করেন, ঠিক একই সময়ে হিশামের হুন্দাই জেনেসিস গাড়িটিও ওই একই এলাকাগুলো প্রদক্ষিণ করছিল।
হিশামের সঙ্গে যখন প্রথম গোয়েন্দারা দেখা করেন, তখন তার হাতে ব্যান্ডেজ ছিল। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে আঙুল কেটেছে বলে দাবি করলেও তার আচরণ ছিল সন্দেহজনক। প্রথমে তিনি দাবি করেন, মাছ ধরার জায়গা খুঁজতেই তিনি ওই রাতে ক্লিয়ারওয়াটার গিয়েছিলেন। কিন্তু যখন তাকে লিমনের ফোনের অবস্থানের কথা জানানো হয়, তখন তিনি দ্রুত বয়ান পাল্টে ফেলেন। তিনি তখন দাবি করেন, লিমন ও বৃষ্টি তার গাড়িতে ছিলেন এবং তিনি তাদের সেখানে নামিয়ে দিয়ে চলে আসেন।
তদন্তকারীরা হিশামের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে দেখেন, পুরো ঘরটি অস্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে। ফ্ল্যাটের ডাস্টবিনে একটি রসিদ পাওয়া যায়, যেখানে লাইজল ওয়াইপস, বডি ওয়াশ এবং ফিব্রিজের মতো পরিষ্কারক সামগ্রী কেনার প্রমাণ মেলে। ১৬ এপ্রিল রাত ১০টা ৪৭ মিনিটে এই জিনিসগুলো ডোরড্যাশের মাধ্যমে অর্ডার করা হয়েছিল।
তদন্তে উঠে আসা আরও কিছু ভয়ংকর আলামত:
রক্তাক্ত কাপড় ও ডাক্ট টেপ: ট্র্যাশ কম্প্যাক্টরের (ময়লা পিষার যন্ত্র) ভেতর থেকে রক্তমাখা শার্ট, প্যান্ট, মোজা এবং রক্ত লেগে থাকা একটি রুপালি রঙের ডাক্ট টেপ উদ্ধার করা হয়।
উধাও হওয়া তৈজসপত্র: লিমনের ফ্ল্যাট থেকে রান্নাঘরের ফ্লোর ম্যাট, তোয়ালে এবং লিমনের হাড়ি-পাতিল গায়েব হয়ে গিয়েছিল, যা পরে ময়লার ভাগাড়ে পাওয়া যায়।
ফরেনসিক পরীক্ষা: ফ্ল্যাটের রান্নাঘর থেকে হিশামের শোবার ঘর পর্যন্ত রক্তের ছোপ পাওয়া গেছে। রাসায়নিক পরীক্ষায় হিশামের শোবার ঘরে দুটি মানুষের আকৃতির ছাপ পাওয়া গেছে এবং বিছানার নিচে লুকানো ছিল ট্র্যাশ ব্যাগ ও ডাক্ট টেপ।
চ্যাটজিপিটির কাছে খুনের পরিকল্পনা!
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি বেরিয়ে আসে হিশামের ফোন রেকর্ড থেকে। নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে ১৩ এপ্রিল হিশাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটজিপিটি'র কাছে জানতে চেয়েছিলেন- "কীভাবে একজন মানুষকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যায়।" এমনকি লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনি আবারও চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন, "নিখোঁজ বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক বলতে কী বোঝায়?"
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, হিশাম অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এই পরিকল্পনা করেছিলেন এবং প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আলামত গোপনের চেষ্টা করেছিলেন। বর্তমানে হিশাম আবুঘরবেহ পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন এবং এই জোড়া অন্তর্ধান মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।
সূত্র: টাম্পা বে টাইমস
ডিবিসি/এসএফএল