জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের হত্যাকারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) নারা শহরের একটি আদালতে বিচারক শিনিচি তানাকা ৪৫ বছর বয়সী তেতসুয়া ইয়ামাগামিকে এই সাজা শোনান।
২০২২ সালে দিনের আলোতে আবের হত্যাকাণ্ড বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল এবং জাপানের মতো দেশে যেখানে বন্দুক সহিংসতা অত্যন্ত বিরল, সেখানে এই ঘটনা বড় ধরণের আলোড়ন সৃষ্টি করে। ইয়ামাগামি আদালতে গুলি চালিয়ে আবেকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন। জাপানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে প্যারোলের সুযোগ থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দণ্ডপ্রাপ্ত অনেকেই কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এই হত্যাকাণ্ডকে ‘যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসে নজিরবিহীন’ এবং সমাজের ওপর এর ‘মারাত্মক পরিণতির’ কথা উল্লেখ করে ইয়ামাগামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চেয়েছিলেন। বিচার প্রক্রিয়ার শুরুতে প্রসিকিউটররা যুক্তি দেখান যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ইউনিফিকেশন চার্চের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই আবেকে হত্যা করেছিলেন।
ইয়ামাগামি মনে করেছিলেন, আবের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হত্যা করলে চার্চের দিকে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে এবং এর বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়বে।
অন্যদিকে, বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা ইয়ামাগামির পারিবারিক কষ্টের কথা তুলে ধরে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছিলেন। তারা আদালতে জানান, ইয়ামাগামির মা তাঁর জীবনের সব সঞ্চয় ইউনিফিকেশন চার্চে দান করে দেওয়ায় তাদের পরিবার চরম দুর্দশায় পড়েছিল।
জাপানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইয়ামাগামি আদালতকে জানান যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ওই চার্চের সাথে যুক্ত একটি গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তা পাঠানোয় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে এই কাজ করেন। ১৯৫৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ইউনিফিকেশন চার্চটি জাপানে তাদের অনুসারীদের কাছ থেকে আয়ের বড় একটি অংশ পেয়ে থাকে।
এই হত্যাকাণ্ডের ফলে জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সাথে ইউনিফিকেশন চার্চের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা যায়, দলটির শতাধিক আইনপ্রণেতার সাথে চার্চের সম্পর্ক ছিল, যার ফলে অনেক ভোটার এলডিপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
শিনজো আবে দুই মেয়াদে মোট ৩,১৮৮ দিন জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২০ সালে স্বাস্থ্যের কারণে পদত্যাগ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা অল্প কয়েকজন বিশ্বনেতার মধ্যে অন্যতম ছিলেন।
বর্তমানে শিনজো আবের ভাবশিষ্য সানায়ে তাকাইচি জাপানের নেতৃত্বে থাকলেও পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে এলডিপির ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। বুধবার রায় ঘোষণার সময় নারা আদালতের বাইরে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়, যা এই মামলার প্রতি ব্যাপক জনআগ্রহের প্রমাণ দেয়।
সূত্র: আল জাজিরা
ডিবিসি/এনএসএফ