নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে জেন জির আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই ভারতের রাজপথে সরব হয়ে উঠেছে আরও নতুন প্রজন্ম। উন্নত স্কুল, নিরাপদ সড়ক, বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত শিক্ষক, মানসম্মত খাবারসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার দাবিতে এবার আন্দোলনে নেমেছে জেন আলফা।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্কুলশিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, পদযাত্রা ও অবস্থান কর্মসূচিতে চাপের মুখে পড়ছে স্থানীয় প্রশাসন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক জেন জির সাম্প্রতিক আন্দোলন নতুন প্রজন্মকেও নিজেদের অধিকার ও দৈনন্দিন সমস্যাগুলো নিয়ে সোচ্চার হতে উৎসাহিত করেছে।
কোথাও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা, কোথাও স্কুলের ফটকে তালা ঝুলিয়ে চলছে প্রতিবাদ। আবার কোথাও দিনের পর দিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে তারা। সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রভাবেই বিভিন্ন রাজ্যে স্কুলের অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা নিয়ে এসব প্রতিবাদ আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
স্বাধীনতা দিবস সামনে রেখে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ গ্রামাঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোর উন্নয়নের দাবিতে ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করেন। এরপর বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় সমস্যা নিয়ে স্কুলশিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
এর আগে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। রাজধানী নয়াদিল্লির জন্তর মন্তরেও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা।
পাকা রাস্তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের পদযাত্রা
উত্তর প্রদেশের হামিরপুরে গত ১১ আগস্ট পাকা সড়কের দাবিতে জাতীয় পতাকা হাতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ের দিকে পদযাত্রা করে একদল স্কুলশিক্ষার্থী।
তাদের অভিযোগ, বৃষ্টির সময় রাস্তা কাদায় পরিণত হওয়ায় স্কুলে যাতায়াত দুর্ভোগের হয়ে পড়ে। এর মধ্যে বন বিভাগ বিকল্প পথও বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে গিয়ে নিজেদের সমস্যার কথা তুলে ধরে।
এর আগে ২৮ জুলাই ফতেহপুরের কিশানপুরে সর্বোদয় ইন্টার কলেজের প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী সুপেয় পানি, শ্রেণিকক্ষে সচল পাখা, অবকাঠামো সংস্কার এবং মানসম্মত মধ্যাহ্নভোজের দাবিতে চার ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।
পরে শিক্ষা কর্মকর্তারা প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে চারটি করে পাখা, পানি ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য দাবি পূরণের লিখিত আশ্বাস দেন।
শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটেও আন্দোলন
রাজস্থানের বারমেরে শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে সরকারি স্কুলের ফটকে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। জালোরের মেগালওয়া গ্রাম ও জয়পুরে বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও প্রতীকী ভাষায় সরকারি স্কুলের জরাজীর্ণ অবস্থা তুলে ধরে প্রতিবাদ জানায়।
বিহারের গয়া জেলার সিমুয়ারা মধ্য বিদ্যালয়ের ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী গত ৩০ জুলাই নিম্নমানের খাবার, ভাঙা চাপকল, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং খেলাধুলার সরঞ্জামের অভাবের প্রতিবাদে টিকরী মহকুমা কর্মকর্তার দপ্তরে বিক্ষোভ করে স্মারকলিপি দেয়।
পরে মহকুমা কর্মকর্তা পাঁচ দিনের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধানের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
বাসভাড়া থেকে শিক্ষক নিয়োগ নানা দাবিতে সরব শিক্ষার্থীরা
মধ্যপ্রদেশের সিরোঞ্জে বাসভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে ক্যানিয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একদল ছাত্রী বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান নেয়। তাদের অভিযোগ, অস্বাভাবিক হারে ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় স্কুলে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।
মহারাষ্ট্রের ধরাশিব জেলার সোনারি গ্রামের জেলা পরিষদ স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবিতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে।
নাগপুরের খেতাপুরে সাত কিলোমিটার কাদামাটির রাস্তা পেরিয়ে স্কুলে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। সেখানে স্কুলবাস চালুর দাবি তুলেছে তারা। অন্যদিকে নাশিকে শিক্ষার্থীরা প্লাস্টিকের বোতলকে মাইক্রোফোন বানিয়ে ভাঙাচোরা রাস্তার দুর্ভোগ নিয়ে নিজেরাই ভিডিও প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
আন্দোলনে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও
উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে নেমেছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক অনুদান এবং স্থায়ী পরিচালক নিয়োগের দাবিতে আগস্টজুড়ে একাধিক দিন বিক্ষোভ করেছে তারা।
স্কুলের মৌলিক অবকাঠামো থেকে শুরু করে নিরাপদ সড়ক, পরিবহন, শিক্ষক সংকট ও মানসম্মত খাবার নানা দাবিতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ নতুন প্রজন্মের নাগরিক সচেতনতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ডিবিসি/ আরএফই