রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা ভাঙতে এবং রণাঙ্গনে ভ্লাদিমির পুতিনের বাহিনীর ওপর নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করতে এক ভয়ংকর কৌশল ঘোষণা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যুদ্ধে জয়ী হতে হলে রাশিয়ার সেনা মোতায়েনের হারের চেয়ে তাদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি হতে হবে। এই সমীকরণ মেলাতে প্রতি মাসে অন্তত ৫০ হাজার রুশ সেনার মৃত্যু বা গুরুতর জখম নিশ্চিত করাকে যুদ্ধের ‘আদর্শ মাত্রা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সম্প্রতি সেনা সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি যুদ্ধের এই নতুন কৌশলের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনীয় ইউনিটগুলোর প্রধান দায়িত্ব হলো এমন মাত্রার ধ্বংসযজ্ঞ নিশ্চিত করা, যাতে দখলদার বাহিনীর মাসিক ক্ষয়ক্ষতি তাদের নতুন করে সেনা মোতায়েনের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়।’ জেলেনস্কির মতে, একমাত্র এই পথেই রাশিয়াকে পিছু হটতে বাধ্য করা সম্ভব। আর এই লক্ষ্য অর্জনে ইউক্রেন তাদের নিজস্ব ড্রোন উৎপাদন ও ব্যবহারের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তার দাবি অনুযায়ী, ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, শুধুমাত্র গত ডিসেম্বর মাসেই প্রায় ৩৫ হাজার রুশ সেনা নিহত অথবা গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। এই সংখ্যাটি নভেম্বরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, এই পরিসংখ্যানে সেই সব রুশ সেনাদের ধরা হয়েছে, যারা নিহত হয়েছেন অথবা এমনভাবে পঙ্গু হয়েছেন যে তাদের পক্ষে আর কখনোই যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসা সম্ভব নয়।
ইউক্রেনের সরকারি ভাষ্যমতে, ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রায় ১২ লাখ সেনা নিহত বা চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (CSIS) এর হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার মোট সৈন্য ক্ষয়ের সংখ্যা ১২ লাখের কাছাকাছি হলেও, এর মধ্যে নিহতের সংখ্যা অন্তত ৩ লাখ ২৫ হাজার। অন্যদিকে, ইউক্রেনের মোট সৈন্য ক্ষয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ, যার মধ্যে নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। অবশ্য আল-জাজিরা স্বাধীনভাবে উভয় পক্ষের এই দাবিকৃত পরিসংখ্যান যাচাই করতে পারেনি।
যুদ্ধের ময়দানের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখনো এক ধরণের অচলাবস্থা বিরাজ করছে। ২০২২ সালের মার্চ মাসে রাশিয়া ইউক্রেনের এক-চতুর্থাংশের বেশি এলাকা দখলে নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী মাসগুলোতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে তারা কিয়েভ ও খারকিভসহ উত্তরাঞ্চল থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। বর্তমানে ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৯.৩ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব দোনবাসের দোনেৎস্ক অঞ্চলে কয়েকটি শহর দখলে নিতে রাশিয়া গত ছয় মাসের বেশি সময় ধরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রেখেছে, তবুও তারা সেখানে বড় কোনো কৌশলগত সাফল্য পায়নি।
জেলেনস্কির ঘোষিত এই নতুন কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অত্যাধুনিক ড্রোনের ব্যবহার। তার দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে আঘাত হানা লক্ষ্যবস্তুর প্রায় ৮০ শতাংশই ধ্বংস করা হচ্ছে ড্রোনের মাধ্যমে। গত এক বছরে রুশ বাহিনীর প্রায় ৮ লাখ ১৯ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে সফল ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ড্রোন অপারেটরদের উৎসাহিত করতে চালু করা হয়েছে বিশেষ পয়েন্ট ও আর্থিক পুরস্কার ব্যবস্থা। কোনো ড্রোন অপারেটর যদি অক্ষত অবস্থায় কোনো রুশ ট্যাংক ধ্বংস বা দখল করতে পারেন, তবে তাকে সর্বোচ্চ ২৩ হাজার ডলার পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, রণাঙ্গনের বাইরেও সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে রাশিয়া তাদের হামলা জোরদার করেছে। সম্প্রতি শত শত রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের লাখ লাখ বাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চললেও, শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়েছে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা
ডিবিসি/এএমটি