মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাতের জেরে তীব্র জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে শ্রীলঙ্কা সরকার। দেশটির সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রতি বুধবার ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে এখন থেকে শ্রীলঙ্কায় সাপ্তাহিক ছুটি কার্যকর হবে টানা তিন দিন। আজ মঙ্গলবার এক জরুরি বৈঠকে প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন যে, দেশকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে তিনি পরিস্থিতির উন্নতির ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে লঙ্কা সরকার ইতিমধ্যেই ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান অভিমুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর সংঘাতটি পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধের কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এশিয়ায় ব্যবহৃত তেল ও গ্যাসের প্রায় ৯০ শতাংশই এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে এশীয় দেশগুলোর ওপর। পরিস্থিতি সামাল দিতে থাইল্যান্ড সরকার নাগরিকদের কোট-স্যুটের বদলে হালকা পোশাক পরে এসি ব্যবহারের সাশ্রয় করার পরামর্শ দিয়েছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারে লাইসেন্স নম্বর অনুযায়ী এক দিন পরপর ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশেও জ্বালানি সাশ্রয়ে কিছুদিন রেশনিং চললেও ঈদের সুবিধার্থে আপাতত তা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনে সরকারি দপ্তরে সপ্তাহে অন্তত একদিন বাসা থেকে কাজ করা বাধ্যতামূলক করে ট্রাইসাইকেল চালক ও কৃষকদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করেছেন প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র। একইভাবে ভিয়েতনাম সরকারও নাগরিকদের ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে সাইকেল চালানো ও কারপুলিং করার জন্য উৎসাহিত করছে।
শ্রীলঙ্কায় চালু হওয়া চার দিনের কর্মসপ্তাহের এই নিয়ম স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসনের মতো জরুরি সেবাগুলো এই ছুটির আওতামুক্ত থাকবে। এছাড়া জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে দেশটিতে আবারও ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ বা জ্বালানি কার্ড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১৫ লিটার এবং মোটরসাইকেলের জন্য মাত্র ৫ লিটার তেল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ২০২২ সালের সেই ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের স্মৃতি মনে করে সাধারণ মানুষ আবারও জনরোষের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে শত শত তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিমা জটিলতার কারণে জাহাজগুলো এগোতে পারছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম চলতি বছর ইতিমধ্যেই ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান দাবি করেছে যে তারা কেবল শত্রুদেশগুলোর জন্য এই পথ বন্ধ রেখেছে, কিন্তু বাস্তবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি থমকে গেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের এই দীর্ঘসূত্রিতা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলবে।
ডিবিসি/এফএইচআর