ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে স্কুলশিক্ষকের ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনায় শিক্ষকের পরিবারের অভিযোগ, স্কুলের পুকুর লিজের টাকা স্থানীয় প্রভাবশালী সাবেক ইউপি সদস্যকে না দেওয়ায় এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
শিক্ষক শাহ আলমকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুলিশ প্রহরায় সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে। হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞ ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন দীপু বলেন, ‘তাঁর শরীরের মাংসপেশিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাড়ে তেমন কোনো সমস্যা নেই।’
স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে বলে গত সোমবার (১৭ আগস্ট) স্কুল কমিটির এক সদস্য প্রধান শিক্ষককে মোবাইল ফোনে জানান। পরে প্রধান শিক্ষক ওই ছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন। প্রধান শিক্ষককে ওই ছাত্রীর মা জানান, স্কুলের সহকারী শিক্ষক শাহ আলম গত ২ সপ্তাহ ধরে তার মেয়েকে দুপুরে খাওয়ার জন্য ১০ টাকা করে দেন। সোমবার (১৭ আগস্ট) শিক্ষক শাহ আলম নিজের হাতে ‘ওয়াশরুমে যাও’ লিখে ওই ছাত্রীকে দেখান। লেখাটি দেখে ওই ছাত্রী বাড়িতে চলে যায়।
এ ঘটনার জেরে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে বড় বাইশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে স্কুলের অফিস কক্ষে ঢুকে বেধড়ক মারধর করে স্থানীয় ১০-১২ জন। হামলায় স্থানীয় সৌরভ সরকারসহ বেশ কয়েকজন নেতৃত্ব দেয় বলে ভিডিও চিত্র পর্যবেক্ষণে এবং আহত শিক্ষকের স্বজনদের মাধ্যমে তথ্য পাওয়া গেছে।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী রামচন্দ্রপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লা মঙ্গলবার স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদকে ডেকে সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি অবহিত করেন। এর কিছুক্ষণ পরেই স্কুলের অফিসে স্থানীয় লোকজন মব সৃষ্টি করে সহকারী শিক্ষকের ওপর হামলা চালায়। হামলার পরে শিক্ষকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্থানীয় লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে স্কুলের ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলে। পরে তারা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে শিক্ষার্থীর হাতে লেখা অভিযোগপত্র তুলে দেয়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, ‘ওই ছাত্রীর চাচাসহ উপস্থিতির কাছে লিখিত অভিযোগপত্র চাই। পরে তারা ঘটনাস্থল থেকে একটু দূরে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে সাদা কাগজে হাতে লেখা অভিযোগপত্র দেয়। যেখানে ওই ছাত্রীর স্বাক্ষর ছিল না এবং শিক্ষার্থীও উপস্থিত ছিল না।’
এদিকে হামলার শিকার শিক্ষকের স্ত্রী তানিয়া সুলতানা বলেন, ‘স্কুলের পুকুরের লিজের টাকা চেয়েছিল রামচন্দ্রপুর গ্রামের সাবেক মেম্বার ইলিয়াস। আমার স্বামী স্কুলের টাকা অন্য কাউকে না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ায় তার সঙ্গে ২ সপ্তাহ ধরে ঝামেলা চলছিল। স্থানীয় সৌরভ সরকার ও সাবেক মেম্বার ইলিয়াস মিলে একটি প্রভাবশালী চক্র আছে। তারা মিলে স্কুলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেও আমার স্বামীর জন্য পারছিল না। যে কারণে তারা আমার স্বামীর ওপর হামলা করে যৌন নিপীড়ন বলে চালিয়ে দিয়েছে।’ একই অভিযোগ করেন শিক্ষকের বড় ভাই মিজানুর রহমান।
বিষয়টি জানতে ভিকটিম শিশুর মায়ের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বাড়িতে গেলেও তিনি গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে ওই শিক্ষার্থীর চাচা সৌরভ সরকার বলেন, ‘ভাতিজির সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। স্থানীয়রা ওই শিক্ষককে মারধর করেছে।’ হাতে লেখা চিঠি কে লিখেছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভাতিজির কথা হয়তো অন্য কেউ লিখে দিয়েছে। তবে কে লিখেছে, আমি জানি না।’
অভিযোগের বিষয়ে কোলা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বলেন, ‘শিক্ষক শাহ আলমকে চিনিই না। তার সঙ্গে কখনো কথাও হয়নি। আর স্কুলের পুকুরের লিজের টাকা আমি কেন নিতে চাইব? আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি প্রধান শিক্ষককে জানিয়েছিলাম, এলাকার লোকজন ঝামেলা করতে পারে।’
স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ বলেন, ‘ইলিয়াস মেম্বার আমার চাচাশ্বশুর। স্কুলের পুকুর লিজের টাকা নিয়ে আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে কারও সঙ্গে কিছু হয়েছে কি না জানি না। আমি যখন এই স্কুলে ছিলাম না, তখন সহকারী শিক্ষক শাহ আলম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতেন।’
ঝিনাইদহ সদরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম লিকু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘বর্তমান সমাজব্যবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, শিক্ষকরাই যেন এখন সমাজের বড় শত্রু! যে অবস্থা শুরু হয়েছে, তাতে শেষ পর্যন্ত মানসম্মান নিয়ে শিক্ষকতা করা যাবে কি না নিশ্চিত নই। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও স্কুলের বিভিন্ন কাজে মাতবরি করতে না পারার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি কারণে শিক্ষকদের আজ হয়রানি ও মানসম্মান ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।’
এদিকে জেলা পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাসান বলেন, ছাত্রীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া স্কুলের অফিসে ঢুকে শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় যদি কেউ অভিযোগ দেয়, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে সে বিষয়েও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিবিসি/এসভিএন