বর্তমানে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার মতো নগররাষ্ট্র দেখা না গেলেও একবিংশ শতাব্দীর নগররাষ্ট্রের এক বাস্তব উদাহরণ হলো সিঙ্গাপুর। দেশটি ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অন্যান্য সকল সূচকে বিশ্বের সকল দেশকে অনেক আগেই ছাপিয়ে গেছে।
সিঙ্গাপুর এখন শুধু অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি দেশ তা নয়। বরং আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা, উন্নত চিকিৎসাসেবা, বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা, জিরো টলারেন্স দুর্নীতি , বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় এয়ারলাইনস পরিষেবা এবং শক্তিশালী পাসপোর্ট র্যাংকিং নিয়ে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে।
আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বর্তমানে সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও নিরাপদ বিনিয়োগের শীর্ষ ১০টি দেশের একটি স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, চলতি ২০২৪ সালের মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী মাত্র ৫.৯১৭ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশ সিঙ্গাপুরের নমিনাল জিডিপি’র আকার ৫২৫.২২৮ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু আয় প্রায় ৮৮ হাজার ৪৪৭ ডলার। অথচ নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের মোট আয়তন মাত্র ৭৩৪.৩ বর্গকিলোমিটার। সে হিসেবে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে ৮ হাজার ৫৮ জন।
১৯৬৫ সালের ৯ই আগস্ট সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ান ফেডারেশন থেকে আলাদা হয়ে একটি নতুন দরিদ্র দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে নিজের স্থান করে নেয়।
বলা যায়, মালয়েশিয়া ফেডারেশন থেকে একরকম জোর করেই সিঙ্গাপুরকে আলাদা করে দিয়ে স্বাধীন করে দেয়া হয়। একেবারে হতদরিদ্র ও বিশৃঙ্খল দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও লি কুয়ান এর মতো দক্ষ নেতৃত্বের হাতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে ছোট্ট এই দেশ সিঙ্গাপুর। স্বাধীনতা পাওয়ার পর দেশটির প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন ইউসুফ বিন ইসহাক। তিনি মূলত ১৯৬৫-১৯৭০ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন।
তবে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে লী কুয়ান এর নাম ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। তিনি ১৯৫৪-১৯৯২ সাল পর্যন্ত দেশটির যোগ্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করে গেছেন।
সিঙ্গাপুরের বর্তমান রাষ্ট্রপতি হলেন থারমান শানমুগারত্নম। যিনি গত ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালে শপথ নেন। আর তার আগে দেশটির রাষ্ট্রপতি হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন হালিমা ইয়াকুব।
দেশটির টেকসই উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিয়ে আলোচনা করলে সবার প্রথমেই তাদের অতি উন্নত ও বিশ্বমানের উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে হয়। বর্তমানে উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একাধিক র্যাংকিং এ ছোট্ট এই দেশের ২টি বিশ্ববিদ্যালয় টপ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান করে নেয়। বিশেষ করে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর এবং নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর আধুনিক ও বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সারাবিশ্বে বেশ সুপরিচিতি লাভ করেছে।
সিঙ্গাপুরের শুধু উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাই নয় তার পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসাসেবা ও বিশ্বের সেরা এয়ারলাইন্স পরিচালনা করে থাকে দেশটি। বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেরা ও টপ ক্লাস লেভেলের আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্কাই-ট্রাক্স ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, চলতি ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের প্রথম স্থানীয় এয়ারলাইনস হিসেবে কাতার এয়ারওয়েজ এবং দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানীয় এয়ারলাইনস হিসেবে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস নিজেদের নাম লিখিয়েছে।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, চলতি ২০২৪ সালের জুন মাসের হিসেব অনুযায়ী দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪৭.০৮৩ বিলিয়ন ডলার এবং মুদ্রাস্ফীতির হার গত ২০২৩ সালের জুনের হিসেব অনুযায়ী ৫.৫ শতাংশ এবং জিডিপি’র হার ২.১ শতাংশ।
চলতি ২০২৪ সালের মার্চের হিসেব অনুযায়ী সার্বিক বেকারত্বের হার ১.৮ শতাংশ দেখানো হলেও দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যের আকার ও সক্ষমতা দেখলে আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না।
গত ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরের মোট রপ্তানি ও আমদানির পরিমাণ ছিল ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা গত ২০২২ সালে ছিল ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে গত ২০২৩ সালে তার আগের বছর অপেক্ষা মোট বৈদেশিক বাণিজ্য ১০.১ শতাংশ হ্রাস পেলেও সার্বিকভাবে দেশটি অর্থনীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তা একটি টেকসই এবং স্থিতিশীল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
স্বল্প জনসংখ্যা এবং খুবই ক্ষুদ্র আয়তনের দেশ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে সিঙ্গাপুর বিশ্বের ৩২তম শীর্ষ স্থানীয় অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
সূত্রঃ উইকিপিডিয়া, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, স্কাই ট্রাক্স, দ্য স্ট্রেইটস টাইমস, সিএনএন।
ডিবিসি/ এসএসএস