গত এপ্রিলে ইরানকে লক্ষ্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আজ রাতেই একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’, এমন হুমকির পর ইউরোপজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। ইউরোপীয় দেশগুলোর আশঙ্কা ছিল, ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছেন কি না এবং রাশিয়াও ইউক্রেন ইস্যুতে একই ধরনের পথে হাঁটবে কি না। তবে এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হুমকি নয়, বরং এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত সংকটেরই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
ট্রাম্পের ওই হুমকির পর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি একটি কঠোর যৌথ বিবৃতি তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত তা প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। মূলত পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় তারা সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের অনুসৃত ‘নীরব কূটনীতির’ কৌশল বেছে নেয়। অন্যদিকে, ইউরোপের কূটনীতিকরা সে সময় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে যোগাযোগ করেও ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাননি।
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়া এখন আর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। ২০২৫ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পররাষ্ট্র দপ্তরকে ‘অতিরিক্ত বড়’ ও ‘আদর্শগতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট’ আখ্যা দেওয়ার পর প্রায় তিন হাজার কর্মী চাকরি হারান বা স্বেচ্ছায় বিদায় নেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অন্তত ৩০ জন রাষ্ট্রদূতকে হঠাৎ ফিরিয়ে আনা হয়। অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা এই ব্যাপক ছাঁটাইকে ১৯৭৩ সালের ‘স্যাটারডে নাইট ম্যাসাকার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মার্কিন দূতাবাসে কোনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত নেই। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক বারবারা লিফ জানান, ইরান যুদ্ধের সময় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত না থাকাটা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বদলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এখন আবর্তিত হচ্ছে প্রেসিডেন্টের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ওপর। বিশেষ করে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ব্যবসায়ী বন্ধু স্টিভ উইটকফ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৈঠকে এর প্রমাণ মেলে। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণবিষয়ক বিশ্লেষক কেলসি ড্যাভেনপোর্ট ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, ওই আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলে পারমাণবিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের মারাত্মক অভাব ছিল; ফলে ইউরোপীয় কূটনীতিকদেরই অনেক মৌলিক বিষয় মার্কিন দলকে বুঝিয়ে বলতে হয়েছিল।
নীতি নির্ধারণের এই বিশৃঙ্খলা প্রকট হয়েছিল ইউক্রেন ইস্যুতেও। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রিজেট ব্রিঙ্ক জানান, হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগনের কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই হঠাৎ করে ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা সেখানে অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিকদেরও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলেছিল। সিদ্ধান্ত জানার জন্য অনেক সময় কর্মকর্তাদের প্রেসিডেন্টের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রশাসনের এই বিশৃঙ্খল নীতির প্রতিবাদে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন ব্রিঙ্ক।
অস্থিতিশীল এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেল এড়িয়ে সরাসরি ট্রাম্প বা তাঁর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগের কৌশল নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া তাদের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে সরাসরি হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের সঙ্গে এবং জাপান প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মাসায়োশি সনের মাধ্যমে ট্রাম্পের কাছে বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরুর মতে, প্রেসিডেন্টের কাছে সরাসরি পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে কার্যকর পথ।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের শিক্ষক মার্গারেট ম্যাকমিলানের মতে, এই পরিস্থিতি বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বোঝার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ভবিষ্যতে সংঘাত ঠেকানো ও সমঝোতা তৈরির সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এসব দুর্বলতার কথা অস্বীকার করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগটের দাবি, প্রশাসনের এই পরিবর্তনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকে বরং আরও কার্যকর ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে।
সূত্র: রয়টার্স
ডিবিসি/এফএইচআর