পাতালরেলের ভিড় থেকে রোদে ঝলমলে চত্বর তীব্র গরমের কারণে স্পেনে সর্বত্র দেখা যাচ্ছে পুরনো দিনের এক অনুষঙ্গ। এটি এতটাই ছোট যে হাতব্যাগে রাখা যায়। ঐতিহ্যবাহী স্প্যানিশ এই ভাঁজ করা হাতপাখাকে বলা হয় ‘আবানিকো’। খুললে এটি অর্ধবৃত্তের আকার নেয় এবং কবজির সামান্য ঝাঁকুনিতেই বেশ জোরালো বাতাস দেয়।
এবারের গ্রীষ্মে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে একের পর এক তাপপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে ঘরের বাইরে ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এই ঐতিহ্যবাহী হাতপাখা। স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের তরুণ থেকে বৃদ্ধ সবাই এটি ব্যবহার করছেন।
নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের মাঝেও এর ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। গণপরিবহন ও সংগীত উৎসবের মতো জনসমাগমস্থলে নারীদের পাশাপাশি এখন অনেক পুরুষকেও এই হাতপাখা খুলে বাতাস খেতে দেখা যাচ্ছে। জুলাইয়ে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের জমজমাট প্রাইড উদযাপনেও সর্বত্র দেখা গেছে রংধনু রঙের আবানিকো।
আগস্টের এক গরমের দিনে ভালেন্সিয়ার একটি উৎসবে উপহার পাওয়া কাগজের আবানিকো দিয়ে সূর্যের তাপ ঠেকাচ্ছিলেন ২০ বছর বয়সী আনা ফেলিউ। গ্রীষ্মকালে এটি তিনি সব জায়গায় সঙ্গে রাখেন বলে জানান। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সল চত্বরের কাছ থেকে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) তিনি বলেন, ‘এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়, তবে আমার আরও কয়েকটি আবানিকো আছে।’
আগামী বৃহস্পতি ও শুক্রবার মাদ্রিদে তাপমাত্রা বেড়ে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে এমন গরমে মাদ্রিদের জনসাধারণের কাছে আবানিকো যে নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাতপাখা দিয়ে বাতাস খাচ্ছিলেন দাভিদ গনসালেস। তাঁর আবানিকোটি ছিল গোলাপি, বেগুনি ও লাল রঙের। বাতাস খেতে খেতে ৫৩ বছর বয়সী এই প্রৌঢ় বলেন, ‘শুরুতে আমি কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতাম, কারণ এটি মূলত নারীদের সঙ্গেই বেশি যায়। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, এটি দারুণ কাজে লাগে এবং আমার দিনটাও আরও একটু ভালো করে দিচ্ছে।’
ইতিহাসবিদদের ধারণা, ১৫ ও ১৬ শতকে এশিয়ার সঙ্গে পর্তুগালের সমুদ্রবাণিজ্যের মাধ্যমে ভাঁজ করা হাতপাখা ইউরোপে পৌঁছায়। ১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়েই স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী দিয়েগো ভেলাসকেস তাঁর রহস্যময় চিত্রকর্ম ‘দ্য লেডি উইথ অ্যা ফ্যান’ আঁকেন। এতে একজন নারীকে (যিনি সম্ভবত ফরাসি) সূক্ষ্মভাবে কাঠের তৈরি একটি আবানিকো হাতে পোজ দিতে দেখা যায়।
ইউরোপের রাজদরবারগুলোতে হাতপাখা ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠলে স্পেনও নিজস্ব রুচি ও শিল্প গড়ে তোলে। মাদ্রিদ হাতপাখা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং ১৮ শতকের মধ্যে ভালেন্সিয়া স্পেনের হাতপাখা তৈরির রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৮০০-র দশকের মধ্যে স্পেনের অভিজাত সমাজে আবানিকো এতটাই গভীরভাবে জায়গা করে নেয় যে নারীরা এর মাধ্যমে গোপনে প্রেমের ইঙ্গিত, আগ্রহ বা অসন্তোষ প্রকাশ করতেন। সে সময় এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘হাতপাখার ভাষা’।
এরপর স্পেন থেকে হাতপাখা ছড়িয়ে পড়ে লাতিন আমেরিকায়। উনিশ শতকে কিউবার গুয়াহিরাসহ বিভিন্ন গান ও নৃত্যধারা ফ্লামেঙ্কো নৃত্যকে প্রভাবিত করে। ফ্লামেঙ্কো নৃত্যশিল্পীরা আবানিকো বা হাতপাখাকে অভিব্যক্তিপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে ফ্লামেঙ্কোর সঙ্গে হাতপাখার এই সম্পর্ক এটিকে স্পেনের অন্যতম প্রতীকী সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে পরিণত করে। দক্ষিণ স্পেনের ৪৪ বছর বয়সী ফ্লামেঙ্কো নৃত্যশিল্পী কারমেন তোরেস বলেন, ‘হাতপাখা একটি চমৎকার উপাদান। একদিকে এটি কিউবার গরম ও আর্দ্রতার কথা মনে করিয়ে দেয় সেই ভারী, দমবন্ধ করা অনুভূতি। একই সঙ্গে এটি আমাদের আকর্ষণীয় ও ছলনাময়ী আবহ ফুটিয়ে তোলার একটি উপায় দেয়।’
দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে হাভিয়ের ইয়েরান্দির পরিবার মাদ্রিদের ‘কাসা দে দিয়েগো’ নামের প্রখ্যাত দোকান থেকে আবানিকো বিক্রি করে আসছে। তিনি বলেন, ‘গরমই আমাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান ভরসা।’ কাসা দে দিয়েগোর হাতপাখাগুলো স্পেনেই তৈরি। এগুলোর মধ্যে সাধারণ দুই রঙের কাঠের হাতপাখা থেকে শুরু করে মুক্তা ও ঝিনুকের খোল দিয়ে তৈরি জটিল ফুলের নকশায় হাতে আঁকা বাহারি হাতপাখা সবই রয়েছে।
এই পাখাগুলোর দাম মোটামুটি ৩০ ইউরো (৩৫ ডলার) থেকে শুরু করে ২০০ থেকে ৫০০ ইউরো (সর্বোচ্চ ৫৮০ ডলার) পর্যন্ত হয়ে থাকে। উচ্চমানের কিছু হাতপাখা ৬ হাজার ইউরো (প্রায় ৭ হাজার ডলার) পর্যন্ত বিক্রি হয়। ইয়েরান্দি জানান, পাখায় ব্যবহৃত উপকরণের ওপর দামের পার্থক্য নির্ভর করে। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একেকটি হাতপাখা তৈরিতে কারিগরি দক্ষতা।
মাদ্রিদ পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হওয়ায় বিদেশি পর্যটকরাও ইয়েরান্দির হাতপাখা কিনছেন। ইয়েরান্দির মতে, এগুলো বহনযোগ্য এবং বৈদ্যুতিক হাতপাখার চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। তিনি বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত জিনিস একসময় শক্তি হারিয়ে ফেলে, আর সেটা সবসময় সবচেয়ে খারাপ সময়ে ঘটে।’ হাসতে হাসতে তিনি আরও বলেন, ‘নিঃসন্দেহে, এই তাপপ্রবাহ আমাদের ব্যবসার জন্য মঙ্গলজনক।’
আর যারা হাতপাখার মান নিয়ে খুব একটা ভাবেন না, তাদের জন্য পর্যটকদের বিভিন্ন স্টলে মাত্র কয়েক ইউরোতেই নকশা ছাপানো প্লাস্টিকের হাতপাখা পাওয়া যায়। ইয়েরান্দির দোকান থেকে কয়েকশ মিটার দূরের একটি স্টলের বিক্রেতাও জানান, চলতি গ্রীষ্মে হাতপাখার বিক্রি বেশ ভালো হয়েছে।
ডিবিসি/এমএনকে